সোমবার , ০৬ এপ্রিল ২০২০ |

দূর্যোগে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা

৪টি কর্মপরিকল্পনা এবং কৃষকের প্রাপ্তি

  সোমবার , ০৬ এপ্রিল ২০২০

কৃষিবিদ রাসেল আহমেদ

করোনা  অভিঘাত মোকাবেলার জন্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহযোগীতার একটি প্যাকেজ ঘোষনা করেছেন।নজিরবিহীন লক ডাউন ও যোগাযোগ স্থবিরতা দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বানিজ্য, সেবাখাত বিশেষত পর্যটন,এভিয়েশন,হসপিটালিটি খাত,ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা,কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ,পুঁজি বাজার ইত্যাদির উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।যার ফলশ্রুতিতে দূর্যোগ ক্ষতির হ্রাস ও ঝুঁকি প্রশমনের লক্ষ্যে প্রদান করা হচ্ছে একটি  বৃহৎ প্রণোদনা প্যাকেজ।এই প্যাকেজ প্রণোদনায় কৃষক অবশ্যই লাভবান হবে,তবে কতটুকু লাভবান হবে তা কিন্তু ভাববার বিষয় রয়েছে।

অর্থনীতির উপর করোনার ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ ছাড়াও আরো তিনটি কার্যক্রম  বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহন করেছেন।এই তিনটি কার্যক্রমের মধ্যে সবচেয়ে মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি।এখানে যেসব কার্যক্রমগুলো রয়েছে তারমধ্যে একটি হলো বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ।এখন প্রশ্ন হলো বিনামূল্যে বিতরণকৃত খাদ্য সামগ্রীগুলো কি এবং কত টাকার দ্রব্য বিতরণ করা হবে।এই দুইটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

আমরা যদি লক্ষ্য করি বিনামূল্যে বিতরণকৃত দ্রব্য সামগ্রীগুলোর মধ্যে সাধারণত থাকে চাল,ডাল,তেল,লবন,পেঁয়াজ ইত্যাদি ভোগ্য পণ্য।এর মধ্যে একটিও কি পচনশীল বা  কাঁচামাল রয়েছে?

তাহলে কৃষক যারা সবজি উৎপাদন করছে কিন্তু বিক্রি করতে পারছেনা তাদের জন্যে কি কোন উপকারে এলো এই খাদ্য বিতরণ। চাল-ডাল তো রয়েছে মিল মালিকদের কাছে বা মজুদদারদের কাছে।

কিন্তু ফল, সবজি,মাছ,মাংস,ডিম,দুধ এগুলো রয়েছে দুখী কৃষক ও খামারীদের কাছে।যারা একবার দাম না পেলে পরের মৌসুমে ঘুরে দাঁড়ানোর মত ক্ষমতা থাকে না।সুতরাং বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ অবশ্যই কৃষকের স্বার্থ ও উপকারভোগীদের পুষ্টি নিরাপত্তায় এগুলির অন্তর্ভূক্তি বিবেচনা করা একান্ত জরুরী।

সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে সেটি হল লক্ষ্য ভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ।  এক্ষেত্রে প্রাধিকার বিবেচনায় অবশ্যই কৃষক ও প্রান্তিক খামারীদের প্রথমে রাখা একান্ত বাঞ্চনীয়।কারণ চাষীরা যদি অর্থ কষ্টে ভোগে,দু'বেলা দু'মুঠো খেতে না পায় পাশাপাশি নির্বিঘ্নে উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রাখতে ব্যর্থ  হয় তাহলে মুখ থুবড়ে পড়বে দেশের অর্থনীতি।সুতরাং কৃষক ও খামারীদের কষ্ট লাঘবে কৃষকরত্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে এইটাই সকলের প্রত্যাশা।

আবার আমরা যদি ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেজের ব্যপারে একটু নজর দেই তাহলে দেখা যাবে সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর জোড় প্রচেষ্টা করা হয়েছে।এই প্যাকেজটি মুলত চারটি আর্থিক সহায়তাকে একত্রিত করে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রথমত,ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবাখাতের জন্যে দেওয়া হবে ৩০ হাজার কোটি টাকা।এতে কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেনা।তবে অর্থনীতির চাকা সচল হবে এবং মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।যার ফলে কৃষকের পন্য বিক্রিতে ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি অনেকটিই নিশ্চিত হবে।
দ্বিতীয়ত,ক্ষুদ্র (কুটির শিল্প) ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋন সুবিধা দেওয়া হবে।এটিতেও কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেনা।কিন্তু কৃষি ভিত্তিক ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো হাফ ছেড়ে বাঁচবে।ফলে ত্বরান্বিত হবে কৃষি কার্যক্রম, গতি আসবে সার,বীজ কীটনাশক, সেচ যন্ত্রপাতি, মৎস্য হ্যাচারি,ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্পে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে ব্যাংক প্রবর্তিত রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। Black to Back LC তে কাঁচামাল আমদানি ইডিএফ এর আকার ৫ বিলিয়ন ডলার উন্নীত করা হবে।এতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে জোয়ার আসলে প্রত্যাক্ষ ও পরোক্ষাভাবে কৃষকের তেমন একটা লাভের সম্ভবনা নেই বললেই চলে।এটি মুলত গার্মেন্টস মালিকদের জন্যে একটি প্রনোদনা মুলক কার্যক্রম।
চতুর্থত,প্রি শিফমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম এ দেওয়া হবে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋন সুবিধা।এতে কৃষক শ্রেণীর ভাগ্য পরিবর্তনের সম্ভবনা ক্ষীণ।
সবমিলিয়ে গনতন্ত্রের মানষকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্দ্যেগ করোনা দূর্যোগ মোকাবেলার বাতিঘর হিসেবে কাজ করবে বলে আমরা আত্নবিশ্বাসী।এইখানে আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করলে খাদ্য ঘাটতি ও পুষ্টি নিরাপত্তা অন্য মাত্রা ধারণ করবে বাংলাদেশে।সেক্ষেত্রে করোনা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শ্রমিক সংকট দূর করা।তাই কৃষি যন্ত্রপাতির  ভূর্তুকির প্রথা পরিবর্তন করে ৫০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীতকরণ জরুরী অন্তত এই সংকটকালীন মুহুর্তে। এছাড়া উৎপাদনের গতি স্বাভাবিক রাখতে হলে কৃষক ও খামারিদের বিনামূল্যে উপকরণ বিতরণ করা জরুরি ।কৃষকের স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।কারণ কৃষক যদি করোনায় আক্রান্ত হত তাহলে এর প্রভাব সকল পর্যায়ে আঘাত হানবে।দেখা দিতে পারে দুর্ভিক্ষ, সমাজে বেড়ে যাবে ছিনতাই, রাহাজানি,হত্যার মত জঘন্য অপরাধ।সুতরাং কৃষিখাতে এত বড় আকারে না হলেও ছোট আকারে প্রণোদনার প্যাকেজ এখন সময়ের দাবী৷

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ