বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল ২০২০ |

‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখুন ‘সামাজিক দূরত্ব’ নয়

মো: ইয়ামিন   বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল ২০২০

বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত এবং আতঙ্কিত বিষয়ের নাম হচ্ছে ‘করোনাভাইরাস’। এ ভাইরাস গোটা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং রীতিমতো টালমাটাল করে ছাড়ছে।  করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর পদক্ষেপ হিসাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্বেচ্ছায় নিজেকে আলাদা করে রাখার অর্থাৎ সেলফ আইসোলেশনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

বিশ্বের যেসব দেশে এই ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার ঘটছে, সেখানে নিত্য প্র্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির দোকান ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। লাইব্রেরি, বাচ্চাদের খেলার মাঠ, বাইরে ব্যায়াম করার জিম এবং অনেক ক্ষেত্রে উপসনালয়গুলোও বন্ধ রাখা হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশেগুলোতে দুজনের বেশি কেউ এক জায়গায় জড়ো হতে পারে না। এক্ষেত্রে একমাত্র ছাড় দেয়া হয় একই পরিবারের সদস্যদের।

ইতোমধ্যে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও ওষুধের দোকান ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক প্রায় সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অফিস-আদালত সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু মাত্র হাসপাতাল, ব্যাংক এবং মিডিয়া হাইজগুলো ছাড়া । সবাইকে ঘরে থাকার রাষ্ট্রীয় নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সারাদেশে সরকারি আদেশ কার্যকর করার জন্য সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা করতে সশস্ত্র বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছে। ফলে, অফিসিয়ালি না-হলেও, আন-অফিসিয়ালি বাংলাদেশেও এক প্রকার ‘লকডাউন’ চলছে বলা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে করোনাভাইরাস থেকে রক্ষার জন্য মানুষকে নানান ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেমন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাবান পানিতে হাত পরিষ্কার করা, অপরিষ্কার অবস্থায় নাকে-মুখে-চোখে হাত না-দেওয়া, ঘরের বাইরে গেলে সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করা, সোস্যাল ডিসট্যান্স বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং কাশি শিষ্টাচার মেনে চলা প্রভৃতি। এ নিবন্ধটির কেন্দ্রীয় মনোযোগ হল ‘সোস্যাল ডিসট্যান্স’ বা ‘সামাজিক দূরত্ব’ যে আইডিয়াটা ধার করা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়সহ পৃথিবীর বিভিন্ন জার্নালে ও মিডিয়ায় প্রকাশিত করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জনপ্রিয় প্রেসক্রিপশন থেকে।

যেমন,  কিংবা দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত Anne Gulland-এর একটি জনপ্রিয় নিবন্ধে সামাজিক দূরত্বের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে চারটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে; ১. কেবলই প্রয়োজনে বাজার করা, ২. দিনে একবারের বেশি শরীরচর্চা না-করা, ৩. অসুস্থতার প্রয়োজনেই কেবল বাইরে যাওয়া, ৪. যদি ঘরে বসে কাজ করা সম্ভব না-হয়, তখনই কেবল অফিসে যাওয়া।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাণু-সংক্রামক বিভাগের সিনিয়র পরিচালক লিজা মারাগাকিস, তার Coronavirus, Social Distancing and Self-Quarantine প্রবন্ধে সামাজিক দূরত্বের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন চারভাবে: ১. অফিসের বদলে বাসায় কাজ করা, ২. স্কুলে ক্লাস না-নিয়ে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া, ৩. প্রিয় মানুষের কাছে সশরীরে না-গিয়ে ইলেকট্রনিক্স বস্তুর (মোবাইল) মাধ্যমে যোগাযোগ করা, ৪. বড় ধরনের সভা-সমাবেশ বাতিল করা বা এড়িয়ে চলা।

করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত বিশ্ব স্বাস্থ্য তথ্যগুলোতে ঘুড়েফিড়ে সামাজিক দূরত্বের একই ‘শব্দটা’ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দূরত্ব আর বাংলাদেশের মতো দেশের সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দূরত্ব এক ‘জিনিস’ নয়। সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দূরত্বের ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে উপলব্ধি না-করে ঐ সমাজ-বাস্তবতায় নির্মিত কেবল অন্যের দেওয়া ধার ফর্মুলা দিয়ে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় চিকিৎসা করলে, ‘হিতে যে বিপরীত’ বা ‘ততোটা কার্যকর’ নাও হতে পারে, সেটা আমরা একবারও বিবেচনায় নিই নাই।

এ জন্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ (ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাবান পানিতে হাত পরিষ্কার করা, অপরিষ্কার অবস্থায় নাকে-মুখে-চোখে হাত না-দেওয়া, সার্জিক্যাল মাস্ক এবং হ্যান্ড গ্লাস ব্যবহার করা প্রভৃতি) মেনে চলার চেষ্টা করলেও সামাজিক দূরত্ব ঠিকমতো মেনে চলছে না। কেননা একজনের সঙ্গে অন্যজনের মধ্যে কমপক্ষে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলাকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ হিসেবে মানুষকে বোঝানো অনেকটা কঠিন বটে! এ জন্য বিভিন্ন ওষুধের দোকানের সামনে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানের সামনে ছয় ফুট অন্তর অন্তর গোলাকার মার্ক দিয়ে মানুষকে শেখাতে হচ্ছে কীভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রামক রোধে নিজেদের মধ্যে ‘শারীরিক দূরত্ব’ মেনে চলতে হবে, যাকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা মোটেও আমাদের সমাজ বাস্তবতায় সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দূরত্বকে নির্দেশ করে না। ফলে, ‘শারীরিক দূরত্ব’কে ‘সামাজিক দূরত্ব’ হিসেবে বুঝানোর চেষ্টার কারণে বিষয়টি এখনও একটা বড় সমস্যা হয়ে আছে ।

এরকম একটি প্রেক্ষাপটে মানুষ কেন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছে না, তার জন্য আমরা রীতিমতো আহাজারি করে চলছি, ফেসবুকে এদেশের জনগণের (বিশেষ করে আমজনতার!) চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে নিত্য মুণ্ডপাত চলছে, এবং মিডিয়ার ক্যামেরামুখী বিশেষজ্ঞরা  রীতিমতো আমজনতার সামাজিকীকরণ ও তাদের নিত্যদিনের জীবন-সংস্কৃতি নিয়ে ‘অসভ্যতা’র প্রশ্ন তুলছেন । কেননা সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত রেলস্টেশনে, বাস-টার্মিনালে এবং লঞ্চঘাটে ঘরমুখী মানুষের স্রোত এবং তাদের নিজের ‘বাড়ি’ বা ‘দেশের বাড়ি’ ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে আমার ‘সামাজিক দূরত্ব’র সবক ভঙ্গের নমুনা হিসেবে হাজির করছি। কিন্তু ভুলটা যে আমাদের, ওই আমজনতার নয়, সেটা আমরা কোনোভাবেই বোঝার চেষ্টা করছি না। কেননা, আমরা আসলে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বলতে ‘শারীরিক দূরত্ব’কে বোঝাতে চাচ্ছি, যাকে আরও সহজ বাংলায় বললে বলা যায় ‘গা ঘেঁষাঘেঁষি’ বা ‘গা লাগালাগি’ বা ‘গা ঠেলাঠেলি’ না-করা কিংবা ‘একজন আরেকজনের কাছ থেকে দূরে থাকা’ প্রভৃতি। সামাজিকতা, সামাজিক সম্পর্ক, সামাজিক রীতিনীতি এবং সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান যে সমাজের কাঠামোকে নির্মাণ করে এবং যে সমাজের মানুষের সম্পর্কের পাটাতন তৈরি করে, সে সমাজের মানুষকে যদি ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখা বোঝাতে গিয়ে আমরা ‘সামাজিক দূরত্বের’ সবক দিই, তাহলে ‘হিতে বিপরীত’ তো হবেই। কেননা, সরকারি ছুটি ঘোষণার পর মানুষ সামাজিক নৈকট্যের তীব্র আশায় নিজের মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়-পরিজন-স্ত্রী-স্বামী-সন্তান-সন্ততির কাছে নিজের ‘দেশে’ ফিরে যাবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া, সরকারি ছুটি মানে ‘দেশে যাওয়া নয়’, বরং ‘বাইরে বের না-হয়ে ঘরের মধ্যে বসে থাকা’, সেটা আগে তো আমরা সবাইকে বুঝিয়ে বলিনি। মানুষগুলো যখন ‘দেশে’ চলে গেছে, তখন আমরা হা-হুতাশ করছি, আর উল্টো তাদেরই মুণ্ডপাত করছি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের শহরগুলো এখনও এ শ্রমজীবী মানুষগুলোর ‘দেশ’ হয়ে ওঠেনি। ফলে, ঢাকাসহ বড় বড় শহরে এসব শ্রমজীবী মানুষ এমনিতেই সামাজিক দূরত্বে (সোস্যাল ডিসট্যান্স) বাস করে। কেননা, তাদের সমাজ বাস করে তাদের ‘দেশের বাড়ি’, যেখান থেকে সে অনেক দূরে (সামাজিক দূরত্বে) জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বাস করে। করোনাভাইরাসের সতর্কতা হিসেবে সে যখন একটা দীর্ঘ ছুটি পায়, তখন সে সামাজিক দূরত্ব ফেলে, সামাজিক নৈকট্য লাভের আশায় ‘দেশের বাড়ি’ ছুটে যাচ্ছে, যা খুবই স্বাভাবিক। এ অবস্থায় আমরা যখন তাদেরকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখার সবক দিই, এটা তার কাছে স্রেফ মশকরা ছাড়া কিছুই নয়। আমাদের বলা জরুরি ছিল, ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখার জন্য যাতে তাদের মধ্যে ‘গা ঘেঁষাঘেঁষি’ বা ‘গা লাগালাগি’ বা ‘গা ঠেলাঠেলি’ না-ঘটে। আমাদের বলা উচিত ছিল, করোনাভাইরাস একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে ছড়ায় প্রধানত শারীরিক ছোঁয়ার মাধ্যমে। সুতরাং আমরা যত গা ঘেঁষাঘেঁষি কম করবো, গা লাগালাগি কম করবো, এবং একজন আরেকজনের সঙ্গে শারীরিক স্পর্শ কম করবো ততো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে। অতএব, আমাদের বলা উচিত ছিল, ‘গা ঘেঁষাঘেঁষি এড়িয়ে চলুন’, কিংবা একজনের সঙ্গে আরেকজনের মধ্যে অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন।

আমাদের দেশের সামাজিক দূরত্বের কারনে নিকট আত্মীয়দের কাছে থেকে অবহেলা-বঞ্চনার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ । বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে সে সব তথ্য দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে  কিছু মানুষ ‘অমানুষে’ পরিণত হচ্ছে । মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে দেখি, মায়ের সর্দি-কাশি, জ্বর হলে ছেলে, ছেলের বউ বা ছেলে-মেয়ে মিলে এমনকি তার স্বামী পর্যন্ত তাকে নিয়ে জঙ্গলে ফেলে আসে। এর থেকে অমানবিক কাজ আর হতে পারে না।” আর এরকম একটা জঘন্য ঘটনা হয়েছে গাজীপুর । এ রকম বহু নিউজ পত্রিকায় ও টিভিতে আমরা দেখচ্ছি।  আরও আতঙ্কিত হই যখন দেখি কোন ডাক্তার এবং অসুস্থ রোগীকে এলাকা ও বাড়ী বের থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয় । যেই বাড়ীতে করোনা রোগী পাওয়া যায় এলাকার মানুষ ঐ বাড়ীকে সাবাই অন্য চোখে দেখা শুরু করে । এ সব বন্ধ করতে হবে না হলে আমাদের  সামনে আর ভয়াবহ অবস্থা অপক্ষো করছে । তাই চলুন সবাই বলি, করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে এবং অন্যকে রক্ষার জন্য ‘সামাজিক দূরত্ব’ নয়, বরং ‘শারীরিক দূরত্ব’ মেনে চলি।


 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ