মঙ্গলবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ |

করোনায় আইভারমেকটিন’র কার্যকারিতা আশাব্যঞ্জক

অনলাইন ডেস্ক   মঙ্গলবার , ০৮ ডিসেম্বর ২০২০

করোনা রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক বা পরজীবীনাশক ওষুধ আইভারমেকটিন প্রয়োগ করে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)।

প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা বলেছেন, হাসপাতালে ভর্তি মৃদু কভিড-১৯ সংক্রমণযুক্ত রোগীদের আইভারমেকটিন প্রয়োগের পর আরটিপিসিআর টেস্টে তারা কভিড-১৯ নেগেটিভ হয়েছেন। সুতরাং মৃদু কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধটির কার্যকারিতা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক এবং এর ব্যবহার নিরাপদ বলে গবেষণায় প্রতীয়মান।

এ সংক্রান্ত এক গবেষণার ফলাফলে আইসিডিডিআর’বি জানিয়েছে, ১৪ দিনের মধ্যে শুধু আইভারমেকটিন নেয়া ৭৭ শতাংশ করোনা রোগী কভিড-১৯ জীবানুমুক্ত হয়েছেন, অর্থাৎ আরটিপিসিআর টেস্টে তারা কভিড-১৯ মুক্ত প্রমাণিত হয়েছেন। পাশাপাশি আইভারমেকটিন এবং ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগ করা ৬১ শতাংশ এবং প্লাসিবো পাওয়া ৩০ শতাংশ রোগী করোনাভাইরাসমুক্ত হয়েছেন।

সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে আইসিডিডিআর,বির এন্টারিক অ্যান্ড রেসপিরেটরি ডিজিজিস এর সিনিয়র ফিজিশিয়ান সায়েন্টিস্ট এবং এই গবেষণার প্রধান গবেষক ড. ওয়াসিফ আলী খান ফলাফল উপস্থাপন করেন।

তিনি বলেন, এটা ছোট আকারের গবেষণার ফল ও বিস্তৃত পরিসরে ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। তবুও প্রাপ্তবয়স্ক কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসার শুরুতে আইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিন ওষুধের ব্যবহারের উপকারিতা দেখা গেছে। এ ছাড়া এই ফলাফল কভিড-১৯ এর চিকিৎসায় আইভারমেকটিনের ব্যবহার-সংক্রান্ত বিশ্বব্যাপী অন্যান্য গবেষণার ফলাফলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আইসিডিডিআর’বি জানায়, এই গবেষণার ফলাফলের ওপর একটি আর্টিকেল ২ ডিসেম্বর ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইনফেকশাস ডিজিজেসে (আইজেআইডি) প্রকাশ করা হয়েছে।

আইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিন ওষুধ দুটির প্রয়োগের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইভারমেকটিন হচ্ছে অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক অর্থাৎ পরজীবীনাশক ওষুধ। সাধারণত কৃমি অর্থে বোঝায়। আইভারমেকটিনের সঙ্গে ডক্সিসাইক্লিন ওষুধের কম্বিনেশন প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল। পরে বাংলাদেশেও রোগীদের দেওয়া হয়েছিল। ভারত, ইরান আমেরিকাসহ অনেক দেশেই কার্যকর বলে প্রমানিত হয়েছে। আইসিডিডিআর’বি এখন যেটা বলছে সেটা পুরনো তথ্যের নতুন গবেষণা। আমরা এটাকে বলি কাউন্টার সিল বা পুনঃসমর্থন।

এ ধরণের ওষুধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন আছে কি না- জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন এখনো দেয়নি এবং তাদের তালিকার কোন ওষুধ এখনো বলেনি। কিন্তু কভিডের ক্ষেত্রে যেগুলো গবেষণায় প্রাথমিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়, সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলোকে বলা হয় ‘ইমার্জেন্সি ইউজেস অথারাইজেশন’ বা জরুরিভাবে ব্যবহারের জন্য স্বীকৃত।

এই চিকিৎসক জানান, বাংলাদেশে কভিড দেখা দেওয়ার দু’তিন মাস পর থেকেই ওষুধ দুটি ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের কাছে এখনো মনে হচ্ছে এটি কার্যকর এবং এ পর্যন্ত অনেকগুলো গবেষণা দ্বারা এটি সমর্থিত হয়েছে। কমবেশি সব ওষুধেরই কিছু পার্শপ্রতিক্রিয়া আছে। কিন্তু আইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিণের উল্লেখযোগ্য পার্শপ্রতিক্রিয়া নেই। মনে রাখতে হবে, এই ওষুধ দুটির কোনোটিই এন্টি-ভাইরাল বা ভাইরাসকে মেরে ফেলার ওষুধ না। এরা ভাইরাসের বৃদ্ধিকে থামিয়ে বা কমিয়ে দেয়।

আইসিডিডিআর’বি গত ১৭ জুন থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মুগদা জেনারেল হাসপাতালে এই দুই ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চালায়। গবেষণার আওতায় ৬৮ রোগীর মধ্যে ২২ জনকে পাঁচদিন দৈনিক ১২ গ্রাম করে শুধু মুখে খাওয়ার আইভারমেকটিন, ২৩ জনকে এক ডোজের আইভারমেকটিনের সঙ্গে ডক্সিসাইক্লিন (২০০ মিলি গ্রাম প্রথম দিন এবং পরবর্তীতে ১০০ মিলি গ্রাম দিনে দুইবার ৪দিন) এবং ২৩ জনকে প্লাসিবো দেওয়া হয়।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ওষুধ প্রয়োগের তৃতীয় দিনে শুধু আইভারমেকটিন দেওয়া হয়েছে এমন ১৮ শতাংশ, আইভারমেকটিন এবং ডক্সিসাইক্লিন দেওয়া হয়েছে এমন ৩ শতাংশ এবং প্লাসিবো দেওয়া ৩ শতাংশ রোগী ভাইরাসমুক্ত হয়েছেন। সপ্তম দিনে এই ফল ছিল ৫০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ এবং ১৩ শতাংশ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান।

তিনি বলেন, আইভারমেকটিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সহায়তা করতে পেরে আমরা আনন্দিত। এটি কভিড-১৯ মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যয় সাশ্রয়ী সমাধান খুঁজে বের করার একটি প্রয়াস। এই গবেষণার সম্ভাবনাময় ফলাফলে আমরা আনন্দিত এবং এটি সত্যিকার অর্থেই কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে আরও বেশি শক্তি যোগাবে এবং অনেক অকালমৃত্যু এড়াতে সাহায্য করবে।

আইসিডিডিআরবি-র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেস বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মাঝারি আয়ের দেশে এই মহামারীর মোকাবিলায় একটি সাশ্রয়ী ও সহজে ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা খুঁজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কভিড-১৯ এর চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে শুধু আইভারমেকটিন ব্যবহার করে আরো বড় মাপের একটি ট্রায়াল করার জন্য আমরা সহায়তা সন্ধান করছি।

অনুষ্ঠানে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. জামিল আহমেদ, বাংলাদেশ মেডিকেলের ডা. তারেক আহমেদ, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আইয়ুব খান, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাব্বুর রেজা উপস্থিত ছিলেন।

 বিশেষ খবর থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ