শনিবার , ১৫ মে ২০২১ |

মোঃ বজলুর রহমান আনছারী: 
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। উন্নয়নকে গতিশীল ও স্থায়ী করতে এস.ডি.জি. ৪ অনুযায়ী শিক্ষার কর্মসূচি প্রণীত হয়েছে। সমন্বিত ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা  এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযোগী সুশিক্ষিত, আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে সরকার পর্যায়ক্রমে ’জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষানীতি’র মুখবন্ধে স্পষ্টতই উল্লেখ ছিল-”শিক্ষানীতি কোন অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়, এর পরিবর্তন ও উন্নয়নের পথ সবসময়ে উন্মুক্ত থাকবে। কোন ভুল-ত্রুটি হলে তা সংশোধন করা যাবে। শিক্ষা একটি গতিশীল বিষয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নের সংগে সংগতি রেখে সবসময়েই এর পরিবর্তন বা আধুনিকীকরণ অব্যাহত থাকবে।” জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হওয়ার ১০ বছর ইতোমধ্যেই অতিবাহিত হয়েছে। বিগত ১০ বছরে শিক্ষানীতি’র অঙ্গীকার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? তা পর্যালোচনার বোধহয় সময় এসেছে। একইভাবে যে অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়ন হয়নি বা বাস্তবায়নে নানা প্রতিকূলতা তৈরী হয়েছে অথবা যেগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব নয় তা সংশোধন করার সময় এখনই। শিক্ষানীতি’র ২৮টি অধ্যায় নিয়ে এত স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা খুবই কঠিন। সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় শুধুমাত্র প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রশাসন এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়েই মূলত: আমার এ লেখা। 

সকল নাগরিককে দক্ষ করে গড়ে তোলার ভিত্তিমূল প্রাথমিক শিক্ষা। শিক্ষার্থীকে জীবন-যাপনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় জ্ঞান, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, জীবনদক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গী, মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা অর্জনের মাধ্যমে মৌলিক শিখন চাহিদা পূরণে সমর্থ করে পরবর্তী স্তরের শিক্ষা লাভের উপযোগী করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করাই প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য। শিক্ষার্থীর নিজ স্তরের যথাযথ মানসম্পন্ন প্রান্তিক দক্ষতা নিশ্চিত করে তাকে উচ্চতর ধাপের শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহী এবং উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বৃদ্ধি করে আট বছর অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তাছাড়া ৫+ বছর বয়স্ক শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদী প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষকের পদ সৃষ্টি ও শ্রেণিকক্ষ বৃদ্ধি করার অঙ্গীকারও শিক্ষানীতিতে ছিল। এ স্তরে আরও যে অঙ্গীকারগুলো ছিল তার মধ্যে ২০১০-১১ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি ১০০% শতাংশে উন্নীত করা; যে সমস্ত গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই সে সকল গ্রামে ন্যূনপক্ষে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা; শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যাস উল্লেখযোগ্য। শিক্ষানীতি’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিল ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা এবং এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রথম ধাপে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি চালু করা হয়। পরবর্তীতে আরও কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি চালু করায় এ জাতীয় বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮০৭ এ। বর্তমানে এ সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অবকাঠামোগত অবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকের ব্যবস্থা করা। তাছাড়াও নতুন শিক্ষাক্রম তৈরী, সৃজনশীল পদ্ধতি ও শিক্ষাক্রমের উপর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যাস অপরিহার্য। এ পর্যন্ত যে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে, সে সকল বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত অবস্থার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপযুক্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিসহ কারিকুলামের উপর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি-না তা এখনও স্পষ্ট নয়। 
তবে এটা নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে, ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত চালু হওয়া দেশের ৮০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে সকল শিক্ষক কর্মরত আছেন তাঁদেরকে এখন পর্যন্ত সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিসহ উপযুক্ত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়নি। এমনকি ঐ সকল বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন ’টিকিউআই’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বিষয় ভিত্তিক শিক্ষকগণকে ঈচউ  প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। ’সেসিপ’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বিষয় ভিত্তিক শিক্ষকগণকে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। অথচ ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত চালু হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণকে ঈচউ বা সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি বিষয়ক প্রশিক্ষণের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা মাদরাসার জেএসসি/জেডিসি উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের সাথে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত চালু হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জেএসসি উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের পার্থক্য থেকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। শুধু তাই নয় এ সকল বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকছে। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ, সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ধারাবাহিক মূল্যায়ন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সহ-শিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের বাইরে রাখা হচ্ছে এ সকল শিক্ষার্থীদের। তাছাড়া এ সকল বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক তত্ত্বাবধান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকলেও ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের বই প্রদান, ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ও জে.এস.সি পরীক্ষা, শিক্ষা জরিপসহ কতিপয় দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা তার অধ:স্থন অফিসগুলোকে পালন করতে হয়।

কারিকুলাম সংশোধন ও পরিবর্তন এবং শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার পুনর্বিন্যাস না করে ২০১৬ সনের মে মাসে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার ঘোষণা দিয়ে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের স্বীকৃতি, অনুমতির দায়িত্ব প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপর ন্যস্ত করা হয়। ৫ম শ্রেণি শেষে সমাপনী পরীক্ষা উঠিয়ে দেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়। কিন্তÍু মন্ত্রিসভায় এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ৫ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা এখনও বহাল আছে। তাছাড়া ২০১৬ সনের জেএসসি পরীক্ষা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিšুÍÍ ২০১৬ সনের জেএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের অল্প ক’দিন পূর্বে হঠাৎ করে পরীক্ষা পরিচালনা করার মত প্রয়োজনীয় প্র¯ুÍÍতি না থাকায় উক্ত পরীক্ষা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ২০১৮ সনের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে হোঁচট খায়। শিক্ষানীতিতে ২০১৮ সনের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার অঙ্গীকার থাকলেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার পরিকল্পনা ২০২১ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়া হয়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনাও প্রণয়ন করেছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনার মধ্যে ছিল ২০২১ সালের মধ্যে ৮ম শ্রেণিতে উন্নীত করণের সকল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা, স্কুল ম্যাপিং, ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন, সারাদেশে বিদ্যমান স্কুলগুলোর মধ্যে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা হবে তাদের অবকাঠামো নির্মাণ, ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানে উপযুক্ত ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনার পুনর্বিন্যাস। স্কুল ম্যাপিং এর কাজ শেষ করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) কে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল। এ জন্য ১০ কোটি টাকাও বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে ২০২১ শিক্ষাবর্ষের চার মাস অতিবাহিত হতে যাচ্ছে। এ কার্যক্রম কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই জানেন। শিক্ষানীতি প্রণয়নের ১০ বছর শেষে ১১ বছরে পা দিয়েছে। যদি এটির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব না হয়, তা হলে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই কেন ৮০৭টি বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা হল? সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণকে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির উপর উপযুক্ত প্রশিক্ষণের আওতায় না এনে শিক্ষার্থীদেরকে কেন বঞ্চিত রাখা হলো? কেনইবা এ সকল বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরকে সহ-শিক্ষাক্রমিক কার্যাবলীসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হলো? ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কোন্ পথে হাটছে প্রাথমিক শিক্ষা?  সত্যিই কি প্রাথমিক শিক্ষা ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হবে? বিগত ১০বছরে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের অনেক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হলেও  শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ এ অংশের বাস্তবায়ন যে গতিতে এগুচ্ছে তা নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। যদি বাস্তবায়ন সম্ভব না হয় তা হলে আর কালক্ষেপন না করে জাতীয় শিক্ষানীতির সংশ্লিষ্ট ধারার সংশোধনী এনে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর পূর্বের অবস্থায় বহাল রাখাই অধিক যুক্তিযুক্ত। 

প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের ন্যায় মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরের কাঠামোগত সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে জাতীয় শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন শিক্ষা কাঠামোয় নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি সংযোজন করা হবে এবং উচ্চ মাধ্যমিক কলেজগুলোতে নবম ও দশম শ্রেণি খোলার অঙ্গীকার ছিল শিক্ষানীতিতে। শিক্ষানীতির মাধ্যমিক  স্তরের কতিপয় অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হলেও মাধ্যমিক স্তরকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার প্রক্রিয়াটি আদৌ বাস্তবায়িত হয়নি। যেহেতু প্রাথমিক স্তরকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হয়নি; ফলে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরকে উন্নীত করার প্রয়াস থেকে সরে আসা উচিৎ এবং শিক্ষানীতির সংশ্লিষ্ট ধারার পরিমার্জন আবশ্যক।

শিক্ষানীতির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ নির্ভর করে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রশাসনের উপর। শিক্ষা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর অঙ্গীকারও ছিল জাতীয় শিক্ষানীতিতে। শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা আনয়ন করে শিক্ষার মানোন্নয়ন কল্পে যে কৌশলগুলো অবলম্বনের অঙ্গীকার শিক্ষানীতিতে ছিল তা হলো-সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন; স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন; সকল ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলী ও পদোন্নতি; অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন; প্রধান শিক্ষা পরিদর্শক এর অফিস স্থাপন; মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে পৃথকীকরণ; পৃথক মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিগত ১০ বছরে উল্লেখিত কৌশলগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা ছাড়া অন্য কোনটিরই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে ভেঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর গঠনের দীর্ঘদিনের দাবী এবং জাতীয় শিক্ষা নীতির অঙ্গীকার থাকলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ এটি বাস্তবায়নে খুব বেশী দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনও নেই; শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা বাস্তবতা এবং চাহিদার আলোকে পুনর্বিন্যাস করা, মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং জেলা শিক্ষা অফিসারের পদটি জেলার অন্যান্য কর্মকর্তার সাথে সুসামঞ্জস্য করা, অ্যাকাডেমিক তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণ জোরদার করার লক্ষ্যে বিদ্যালয়ের সংখ্যানুপাতে বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদ সৃষ্টিসহ শিক্ষা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর অনেক অঙ্গীকার শিক্ষানীতিতে লিপিবদ্ধ থাকলেও ১০ বছরে তা বাস্তবায়নের কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। শুধুমাত্র শিক্ষানীতিতে লিপিবদ্ধ রেখে শিক্ষা প্রশাসনের সংস্কার আদৌ সম্ভব নয়।  সময় এসেছে এ বিষয়গুলো নিয়ে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের। শিক্ষার গুণগত মান এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যানুপাতে কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে সংগতি রেখে শিক্ষা প্রশাসনের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদের সুসামঞ্জস্য বিধান নিশ্চিত করা শিক্ষানীতির অঙ্গীকার এবং সময়ের দাবী।

লেখক : শিক্ষা গবেষক
bransari69@yahoo.com

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ