শনিবার , ১৫ মে ২০২১ |

মোঃ বজলুর রহমান আনছারী: 
দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৯৫ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। যদিও এ সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের শতভাগ সরকার বহন করছেন। এ সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, এমপিওভূক্তিসহ যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো প্রণীত হয় ১৯৯৫ সনে। প্রায় ১৫ বছর যাবত এ জনবল কাঠামো অনুসরণে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দীর্ঘ ১৫ বছর পর তা সংশোধন/পরিমার্জন করে ২০১০ সনে ”বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ) এর শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ প্রদান এবং জনবল কাঠামো সম্পর্কিত নির্দেশিকা-২০১০” প্রণয়ন করে। এ জনবল কাঠামোর  কয়েকটি সংশোধনী এনে ২০১৮ সন পর্যন্ত তা বহাল ছিল। ২০১৮ সনে স্কুল ও কলেজ এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথকভাবে জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০২০ সনে পুনরায় কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ”বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ (২৩ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সংশোধিত) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ পৃথক ভাবে ”বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১” জারি করে। স্কুল ও কলেজের জন্য প্রণীত নীতিমালায় বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। একদিকে যেমন এমপিওভূক্তির শর্তের পরিবর্তন আনা হয়েছে; অপরদিকে তেমনি নতুন কিছু পদ সৃষ্টিসহ কিছু নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আবার পৃথকভাবে জারি হওয়া এ নীতিমালার মধ্যে বেশ কিছু অসঙ্গতিও পরিলক্ষিত হয়েছে। স্কুল ও কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ এর ৩ পৃষ্ঠার ৪নং ক্রমিক এর ৪.১৬ অনুচ্ছেদ এ ’মফস্বল’ এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ”মফস্বল বলতে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা সদরের পৌর এলাকা ব্যতীত অন্যান্য এলাকাকে বুঝাবে”। এ সংজ্ঞা পর্যালোচনায় স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, উপজেলা সদরের পৌরসভা মফস্বল এলাকার আওতাভুক্ত। অপরদিকে মাদ্রাসা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার ৩ পৃষ্ঠার ৪.১৫ অনুচ্ছেদ এ ’মফস্বল’ বলতে বুঝানো হয়েছে, ”স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত সিটি কর্পোরেশন ও পৌর এলাকা ব্যতীত অন্যান্য এলাকাকে বুঝাবে।” এটির পর্যালোচনায়, ’মফস্বল’ বলতে সিটি কর্পোরেশন, জেলা ও উপজেলা সদরের পৌরসভা ব্যতীত অন্যান্য এলাকাকে বুঝায়। স্কুল ও কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ এ মাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানে ’অফিস সহায়ক’ এর নতুন একটি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে; যা মফস্বল এলাকার জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু মাদ্রাসার জনবল কাঠামোতে সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের জন্য ’অফিস সহায়ক’ এর পদ সৃষ্টি করা হয়নি। তাছাড়া  দু’টো পৃথক জনবল কাঠামোর ’মফস্বল’ সংক্রান্ত সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকায় নতুন এ পদ পূরণে জটিলতা তৈরী হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। 
২০১৮ সনের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার ১৩ পৃষ্ঠার ২৪(ঘ) অনুচ্ছেদে উল্লেখ ছিল যে, ”এ নীতিমালার আওতায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার পৃথক আদেশ জারি করবে।” সম্প্রতি প্রকাশিত স্কুল ও কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় ট্রেড ইন্সট্রাক্টর, ট্রেড এ্যাসিসটেন্ট, অফিস সহায়ক ইত্যাদি পদগুলো নতুন ভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাছাড়া ১০ম গ্রেডের ’সহকারী গ্রন্থাগারিক কাম ক্যাটালগার’ পদের নাম পরিবর্তন করে ’সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান)’ নামকরণ করা হয়েছে। এ সকল পদে কখন বা কীভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে তার কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগ তৈরী হয়েছে। ১০ম গ্রেডের ’সহকারী গ্রন্থাগারিক কাম ক্যাটালগার’ পদে নিয়োগের ক্ষমতা ছিল স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটির হাতে। এ পদটির নাম পরিবর্তন করে শিক্ষক হিসেবে মর্যাদা দেয়ায় এবং এখন পর্যন্ত নিবন্ধনের আওতায় না আসায়, পূর্বের ধারাবাহিকতায় কোন কোন প্রতিষ্ঠান এ পদে নিয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ করতে উৎসাহিত হচ্ছে। তাছাড়া স্কুল ও কলেজের জনবল কাঠামোতে ’সহকারি গ্রন্থাগারিক কাম ক্যাটালগার’  পদের নাম পরিবর্তন করে ’সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান)’ করা হলেও মাদ্রাসার জনবল কাঠামোতে তা পরিবর্তন আনা হয়নি। আবার ’কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর’ পদের শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিবর্তন আনা হয়েছে-স্কুল ও কলেজের জনবল কাঠামোতে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড হতে ৩ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা/সমমানের স্থলে ৩ বছর মেয়াদী কম্পিউটার ডিপ্লোমা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মাদ্রাসার সংশোধিত জনবল কাঠামোতে পূর্বের শিক্ষাগত যোগ্যতাই বহাল রাখা হয়েছে। একই গ্রেডের স্কুল ও মাদ্রাসার এ পদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কেন এ পার্থক্য? স্কুলের ক্ষেত্রে কম্পিউটার ডিপ্লোমা ছাড়া নিয়োগ লাভের কোন সুযোগ নেই। অপরদিকে মাদ্রাসার ক্ষেত্রে ৩ বছর মেয়াদী ইঞ্জিনিয়ারিং, মৎস্য অথবা কৃষি ডিপ্লোমাধারীদেরকেও এ পদে নিয়োগ লাভের সুযোগ রাখা হয়েছে। 
স্কুল ও কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ এর ৩নং পৃষ্ঠার ৪.১৮ অনুচ্ছেদে ’স্বীকৃতি’ বলতে ”মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক কোন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে একাডেমিক স্বীকৃতিকে বুঝাবে।” অপরদিকে  মাদ্রাসার জনবল কাঠামোতে ”স্বীকৃতি বলতে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক কোন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পাঠদানের অনুমতি প্রদানকে বুঝাবে।” মাদ্রাসার জনবল কাঠমোতে স্বীকৃতির এ সংজ্ঞাটি যথাযথ হয়নি বলে মনে হয়। কেননা কোন প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি হতে পারে না। জনবল কাঠামোর এ জাতীয় অসঙ্গতি ও অস্পষ্টতার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের দু’টো বিভাগের মাঝে সমন্বয়হীনতাই প্রধান কারণ বলে মনে হয়। 
আবার এমপিওভুক্তির শর্তের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অসঙ্গতি। সংশোধিত মাদ্রাসার জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় এমপিওভূক্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাশের হারের শর্ত শিথিল করা হয়েছে। কিন্তÍু কলেজ এমপিওভূক্তির ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল না করে শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংশোধিত মাদ্রাসার জনবল কাঠামোতে এমপিওভূক্তির ৪টি সূচকের মধ্যে পরীক্ষার্থী ও পাশের হার কমিয়ে শর্ত শিথিল করা হয়েছে। স্কুল এমপিওভূক্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী ও পাশের হারের শর্ত শিথিল করা হলেও কলেজ এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে ৩টি সূচকের মধ্যে শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী সংখ্য বৃদ্ধি করে এমপিওভূক্তির শর্ত আরও কঠিন করা হয়েছে। 
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে অন-লাইন পদ্ধতি চালু হওয়ায় মফস্বলের অনেক কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা হ্্রাস পেয়েছে। তাছাড়া এমপিওবিহীন পাঠদানের অনুমতিপ্রাপ্ত বা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ সকল কলেজের শিক্ষকের শুণ্য পদ পূরণে এনটিআরসিএ’র দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এনটিআরসিএ’র সুপারিশ পেয়েও অনেকেই যোগদান না করায় এমপিও বিহীন অনেক মফস্বল কলেজের শুণ্য পদ ফাঁকা থাকছে বছরের পর বছর। নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উপজেলা বা জেলা কোটা অনুসরণ না করে জাতীয় মেধার ভিত্তিতে শুণ্য পদে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েও মফস্বল বা দূরবর্তী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অনেকেই যোগদান করেন না। কেউ যোগদান করলেও প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আসেন না। আবার কেউ যোগদান করেও কিছু দিন পর চলে যান। এভাবে মফস্বলের নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানসমূহ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। উপরোন্ত মফস্বলের এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের এমপিওভূত্তির শর্ত শিথিল না করে আরও কঠিন শর্ত আরোপের মাধ্যমে এ সকল প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন এমপিও’র বাইরে রাখার কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। 
পাঠদানের অনুমতিপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের শুণ্য পদ পূরণে প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ভিত্তিতে এনটিআরসিএ সুপারিশ প্রদান করে আসছে। কোন প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতির জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট বোর্ড কর্তৃক পরিদর্শন প্রতিবেদনে স্টাফিং প্যাটার্নভূক্ত শুণ্য পদ পূরণ হয়েছে কি-না তা উল্লেখ করতে হয়। কিন্তÍু পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পূর্বে স্থাপনের অনুমতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে জনবল কাঠামো অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিতে পারবে কি-না তা জনবল কাঠামোতে স্পষ্ট করা হয়নি।
সম্প্রতি জারি হওয়া স্কুল ও কলেজ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় বিদ্যমান অসঙ্গতি ও অস্পষ্টতা দূরীকরণ, স্কুল ও মাদ্রাসার মত কলেজের ক্ষেত্রেও এমপিওভূক্তির শর্ত শিথিল করে স্থাপনের অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগের নির্দেশনা প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবী।
                                                                                        লেখক ঃ শিক্ষা গবেষক
 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ