বুধবার , ২৮ July ২০২১ |

মোঃ বজলুর রহমান আনছারী
গত ২১মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ তারিখে  ’দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকায় প্রকাশিত সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতি শ্রদ্ধেয় জনাব ওবায়দুল হাসান স্যারের ”কুলপোতাক- অসাম্প্রদায়িক বাংলার প্রতিচ্ছবি” শিরোনামের লেখাটিতে ’কুলপোতাক’ গ্রামটি সত্যিকার অর্থেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ- তা অত্ত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। লেখক গত ১ এপ্রিল কুলপোতাক গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলেন। গ্রামের সম্প্রীতিপ্রিয় মানুষগুলোর আন্তরিকতা ও ভালবাসার কথা লেখক চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান এ তিন সম্প্রদায়ের মানুষ গ্রামটিতে মিলেমিশে বসবাস করছে; এ লেখায় তা ফুটে উঠেছে। লেখাটি আমি একাধিবার পড়েছি। এর পেছনে অবশ্য একাধিক কারণও রয়েছে। প্রায় বছর চারেক আগে বিচারপতি স্যারের অনুজ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব জনাব সাজ্জাদুল হাসান স্যার কর্তৃক কুলপোতাক গ্রামে একটি ব্রিজের ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন ও বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের সুবাধে ঐ গ্রামে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের আদর্শ নগর এলাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় বহুবার যেতে হয়েছে ঐ এলাকায়। আদর্শনগরে প্রতিষ্ঠিত শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়; যার ঈর্শ্বনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিশাল সবুজ মাঠ, দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি যে কাউকে আকৃষ্ট করে অবলিলায়। তাছাড়া ঐ এলাকায় স্থাপিত হয়েছে কৃষি ব্যাংকের একটি শাখা ও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র। দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে পর্যটন কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ। এ সব কিছুর  পেছনের কারিগর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও বর্তমান বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জনাব সাজ্জাদুল হাসান। সমসাময়িককালে দ্রুত উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়ে বিচারপতি স্যারের পরিবারের সদস্যদের প্রতিও জন্ম নিয়েছে ঐ এলাকার জনগণের অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। আদর্শনগরের সন্নিকটেই কুলপোতাক গ্রাম। এ গ্রামে তিনটি সম্প্রদায়ের মানুষ যেভাবে সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করছে; তা আমার নিজ গ্রাম নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা উপজেলাধীন ’বরদল’ গ্রামের সাথে তুলনা না করে পারছি না। মোহনগঞ্জের ’কুলপোতাক’ ও কলমাকান্দার ’বরদল’ গ্রাম দুটোই নেত্রকোণা জেলায় অবস্থিত। বিচারপতি স্যারের লেখাটি পড়ে আমি আমার নিজ গ্রাম সম্পর্কে লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। 
নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী এলাকা কলমাকান্দা শিক্ষা-দীক্ষায় অনুন্নত এবং পিছিয়ে পড়া এক জনপদ। ভারতের মেঘালয় সংলগ্ন এ উপজেলার জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ উপজাতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি না হলেও পাহাড়, হাওর, নদী বেষ্টিত উপজেলাটিতে রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান। সীমান্ত ঘেষা লেংগুড়া ইউনিয়নে পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীর ধারেই অবস্থিত সাত শহীদের মাজার, রংছাতি ইউনিয়নের ’পাতলাবন’, ’চন্দ্রডিঙ্গা’ পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বার বার। পার্শ্ববর্তী দূর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুরের চিনা মাটি, রাণিখং মিশন, উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি, রাশি মনি স্মৃতি সৌধ-জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর অন্যতম। কলমাকান্দা থেকে দূর্গাপুর উপজেলার দূরত্ব প্রায় ২৫ কি.মি। দুটো উপজেলার সংযোগ রক্ষাকারী একমাত্র পাকা রাস্তার পাশেই অবস্থিত ’বরদল’ গ্রাম। কলমাকান্দা থেকে প্রায় ৭ কি.মি পশ্চিমে এবং দূর্গাপুর থেকে প্রায় ১৮ কি.মি পূর্বে পাকা রাস্তার ধারেই ঐতিহ্যময় যে গ্রামটি অবস্থিত তা আমার চেতনার সাথে মিশে আছে। আমি এ গ্রামটি সম্পর্কে কেন লিখছি?  কী আছে এখানে? উন্নয়নের কোন ঈর্শ্বনীয় ছোঁয়া বা দর্শনীয় কিছু না থাকলেও মানুষের ভালবাসা, আন্তরিকতা, সম্প্রীতির কোন অভাব নেই এ গ্রামে। আছে দেশপ্রেম ও সাহসিকতার জলন্ত উদাহরণ। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান এ তিন সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছে অনাধিকাল থেকে। দূর্গাপুর-কলমাকান্দার সংযোগ রক্ষাকারী একমাত্র পাকা রাস্তার উপরই বরদল গ্রামে রয়েছে ছোট্ট একটি বাজার; যার নাম ’আনছারী বাজার’। বাজারের দু’দিকে রাস্তার দু’পাশে রোপিত বৃক্ষগুলো আজ শুধু সৌন্দর্যবর্ধনই নয় পুরো রাস্তাটিকে ঢেকে দিয়েছে সবুজ ছায়ায়। বাজারের উপরই প্রতিষ্ঠিত একটি সুন্দর মসজিদ। এখানে রয়েছে একটি পোস্ট অফিস। আনছারী বাজারের পাশেই অবস্থিত বরদল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরদল উচ্চ বিদ্যালয় ও আব্দুল জব্বার আনছারী মেমোরিয়াল কলেজ। একটি বিশাল মাঠের চতুর্দিকে অবস্থিত ৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপজেলাবাসীর অহঙ্কার। তাছাড়া ছোট্ট এ গ্রামটিতে  রয়েছে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি ঈদগাহ্ মাঠ, একটি মাদ্রাসা। আরও রয়েছে একটি গোরস্থান, একটি শ্মশান ঘাট, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কবরস্থান; আছে মন্দির ও একটি গীর্জা। গ্রামের বেশীরভাগ মানুষের পেশাই কৃষি। আর্থ-সামাজিক অবস্থা খুব সচ্ছল না হলেও শিক্ষার প্রতি রয়েছে তাদের অনুরাগ। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে এ গ্রামে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। এতগুলো প্রতিষ্ঠান এ গ্রামে কীভাবে গড়ে উঠেছে? এ প্রশ্ন অনেকের। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর পরই ১৯৭২ এর গোঁড়ার দিকে যুদ্ধবিদ্ধস্থ একটি স্বাধীন দেশে অজ পাড়াগাঁয়ে এতগুলো প্রতিষ্ঠানের একযোগে যাত্রা কল্পনাকেও হার মানায়। শুধু তাই নয় উপজেলার প্রথম কলেজের যাত্রা শুরু এ গ্রাম থেকেই। এলাকার হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান এ তিন সম্প্রদায়ের স্বপ্নবান মানুষগুলোর দু:সাহসিক নেতৃত্ব, অগাধ দেশপ্রেম, বলিষ্ট উদ্যোগ ও ত্যাগের ফসল এ সকল প্রতিষ্ঠান। শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই নয় সাহসিকতায় পরিপূর্ণ পশ্চাদপদ গ্রামীণ এ জনপদের মানুষগুলো স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাবে অনেক দূর। 
                                                                                                                                             লেখক ঃ শিক্ষা গবেষক
 bransari69@yahoo.com
                                                                                                          

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ