বুধবার , ২৮ July ২০২১ |

মোঃ বজলুর রহমান আনছারী :
দেশের আর্থসামাজিক খাতসমূহের মধ্যে শিক্ষা প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ খাত। সমাজ পরিবর্তন, সমাজ উন্নয়ন এবং আর্থসামাজিক বিকাশের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর মাধ্যম হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। সমাজ পরিবেশের সার্বিক উন্নয়নই টেকসই উন্নয়ন। মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যতীত উন্নয়নকে টেকসই করা এবং উন্নয়নের সুফল বন্টনে সমতা আনা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। অর্থাৎ উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন জরুরি। আর মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষা এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী হাতিয়ার। উন্নত দেশসমুহ সময়ের বিবর্তনে, প্রযুক্তির উন্নয়নে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষায় বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও তার জন্মলগ্ন থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্কার, মতামত, সুপারিশ, প্রতিবেদন ও শিক্ষানীতি প্রণয়নকল্পে ৩টি শিক্ষা কমিশন, ১টি শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদ, ১টি শিক্ষা সংস্কার বিশেষজ্ঞ কমিটি ও ২টি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে। সর্বশেষ অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করে। বর্তমান শিক্ষানীতির বয়স ১০ বছর অতিবাহিত হয়েছে। 
শিক্ষানীতির সফল বাস্তবায়ন, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ নির্ভর করে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রশাসনের উপর। শিক্ষা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর অঙ্গীকারও ছিল জাতীয় শিক্ষানীতিতে। শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা আনয়ন করে শিক্ষার মানোন্নয়নকল্পে যে কৌশলগুলো অবলম্বনের অঙ্গীকার শিক্ষানীতিতে ছিল, তা হলো-সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন; স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন; সকল ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলী ও পদোন্নতি; অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন; প্রধান শিক্ষা পরিদর্শক এর অফিস স্থাপন; মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে পৃথকীকরণ; পৃথক মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিগত ১০ বছরে উল্লিখিত অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা ছাড়া অন্য কোনটিরই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে ভেঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর গঠনের দীর্ঘদিনের দাবী এবং জাতীয় শিক্ষা নীতির অঙ্গীকার থাকলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভেঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ নামে দু’টো পৃথক বিভাগ গঠন করা হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে; অপরদিকে দু’টো বিভাগের কাজের মাঝে তৈরী হয়েছে সমন্বয়হীনতা ও নানা অসঙ্গতি। তাছাড়া পরিবর্তিত পরিস্থিতির সংগে অনেক সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় অসঙ্গতি তৈরী হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ সকল অসঙ্গতি দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বাঁধাগ্রন্থ হবে শিক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জন। যে বিষয়গুলো এখনই  ভেবে দেখা প্রয়োজন।
করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যনেজিং কমিটির মেয়াদকাল সংক্রান্ত ঃ বর্তমান প্রবিধিমালা অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি/গভর্ণিং বডির মেয়াদকাল দুই বছর। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ম্যানেজিং কমিটি/গভর্ণিং বডির মেয়াদ শেষে এডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান এডহক কমিটি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে একাধিকবার এডহক কমিটি গঠন করেছে। ৬ মাস পর পর এভাবে এডহক কমিটি গঠন করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানসমূহকে নানা ধরণের দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় করোনা পরিস্থিতির কারণে বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান পরিষদের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। দেশের হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দূর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা কল্পে ম্যানেজিং কমিটি/এডহক কমিটির মেয়াদ শেষে বার বার এডহক কমিটি গঠন না করে পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি/গভর্ণিং বডি গঠণের পূর্ব পর্যন্ত বর্তমান কমিটির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিৎ। 
অনুমতি বিহীন প্রতিষ্ঠান স্থাপন/পরিচালনা সংক্রান্ত ঃ শিক্ষা মন্ত্রলণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ তারিখের ৩৭.০০.০০০০.০৭২.৪৪.০৩০.১৫(অংশ)-৪১৭ নং স্মারকের পত্রে মন্ত্রণালয় হতে প্রাথমিক অনুমতি ব্যতিরেকে কোন প্রতিষ্ঠান স্থাপন কিংবা চালু করা যাবে না- এমন নির্দেশনা সম্বলিত বিজ্ঞপ্তি জারি হলেও মাঠ পর্যায়ে এটির তেমন কোন প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়নি। অপরদিকে অনুমতি বিহীন প্রতিষ্ঠানেও বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরণের জন্য এনসিটিবি’র নির্দেশনা রয়েছে। মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি’র এ জাতীয় পরস্পর বিরোধী সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। দেশের সকল জেলা/উপজেলায় অনুমতি বিহীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে- এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। শুধুমাত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অনুমতি বিহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা অসম্ভব। 
কমিটি বিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষর সংক্রান্ত ঃ ১৯ আগস্ট ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ তারিখে জারিকৃত উপজেলা থেকে আঞ্চলিক কার্যালয় পর্যন্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের আদেশে কমিটি বিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষরের ক্ষমতা জেলা শিক্ষা অফিসারকে অর্পণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয় মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত আদেশে কমিটি বিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষরের ক্ষমতা জেলা শিক্ষা অফিসারকে অর্পণ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা বোর্ড এ ক্ষমতা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উপর অর্পণ করে থাকে। ফলে একই বিষয়ে দুই ধরণের নির্দেশনায় মাঠ পর্যায়ে জটিলতা তৈরী হচ্ছে। এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ড, মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। 
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি সংক্রান্ত ঃ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য ম্যানেজিং কমিটি আছে কি-না তা অনেকের কাছেই অস্পষ্ট। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ০৮/০২/২০০৩ খ্রিঃ তারিখের শিম/শা:১০/২৫ মাসিক সমন্বয় সভা-১/৯৮/৯৬(৭০০)-শিক্ষা স্মারকে শুধুমাত্র জেলা পর্যায়ের সরকারি স্কুল সমূহের জন্য ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়। জেলা পর্যায়ের সরকারি স্কুল সমূহের জন্য ম্যানেজিং কমিটির প্রয়োজনীয়তা থাকলে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির প্রয়োজনীয়তা না থাকার যৌক্তিকতা কতটুকু ? এ বিষয়ে জেলা ও উপজেলার সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য একই বিধান থাকাই সমীচীন। 
পদবী পরিবর্তন ঃ প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবী ’জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার’, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবী ”উপজেলা শিক্ষা অফিসার”। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবী ’জেলা শিক্ষা অফিসার’ এবং উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবী ”উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার”। দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবীর সংগে সামঞ্জস্য রেখে দুটো মন্ত্রণালয়ের উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবী  পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক।
কওমী মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ঃ সরকার কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীস সনদকে মাস্টার্স এর সমমান দিয়েছেন। অথচ দেশে কওমী মাদ্রাসার প্রকৃত সংখ্যা কত তা মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এ সকল মাদ্রাসার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয় মাত্র। এ সকল মাদ্রাসায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনতো দূরের কথা নিয়মিত জাতীয় পতাকাও উত্তোলন করা হয় না। এ জাতীয় মাদ্রাসাসমূহকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা সময়ের দাবী।
আঞ্চলিক উপ-পরিচালক ও আঞ্চলিক পরিচালকের দপ্তরের কাজের সমন্বয় সাধন ঃ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ৯টি অঞ্চলে আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের দপ্তর ও পৃথক আঞ্চলিক পরিচালকের দপ্তর রয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে পৃথক দু’টো দপ্তরের প্রয়োজনীয়তা নিরূপন করা আবশ্যক। তাছাড়া পৃথক দুটো দপ্তরের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন দপ্তর/বিভাগের সংগে সমন্বয় করে এ জাতীয় অসঙ্গতিসমূহ দূরীকরণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রশাসনে গতিশীলতা আনয়ন করা অনেকাংশেই সম্ভব। 

লেখক : শিক্ষা গবেষক
 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ