বুধবার , ২৮ July ২০২১ |

কাচ রিসাইক্লিং : কাচ বর্জ্য নয়, সম্পদ

  বৃহস্পতিবার , ১৫ July ২০২১

বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্য উৎপাদন। মাত্রাতিরিক্ত বর্জ্যরে প্রভাব পড়ছে এর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায়। বর্তমানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত হচ্ছে বর্জ্যরে  রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার। দৈনন্দিন উৎপাদিত বিভিন্ন বর্জ্যরে মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো কাচ জাতীয় বর্জ্য, যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য।
গৃহস্থালি এবং শিল্পজাত বর্জ্যে এক বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে কাচ জাত কঠিন বর্জ্য। শিল্প উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কাচ কোয়ার্টজ বালু, সোডা অ্যাশ (প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি সোডিয়াম কার্বনেট), চুনাপাথর, পুনর্ব্যবহৃত কাচ এবং বিভিন্ন যৌগ যোগ করে তৈরি করা হয়, যা অপচনশীল। এটি অনুজীব দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পচে যায় না ফলে বছরের পর বছর একই পরিবেশে অপরিবর্তিত থাকে। যা পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। কাচ অতি ভঙ্গুর হওয়ায় এর বর্জ্যরে পরিমাণও বেশি। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বে মোট কঠিন বর্জ্যরে মধ্যে কাচ জাত বর্জ্যরে পরিমাণ ৫ শতাংশ।
আমাদের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত অসংখ্য কাচ সামগ্রী অপরিকল্পিত এবং অসচেতন ভাবে যত্রতত্র স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। যথাযথ ভাবে এইসব অব্যবহৃত কাচ পুনরুদ্ধার না করা হলে তা পরিণত হয় বর্জ্য।ে অব্যবস্থাপনার ফলে যে বিপুল পরিমান বর্জ্য পরিবেশে জমা হচ্ছে তা অদূর ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। এসব বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ সমস্যার একটি আদর্শ সমাধান হতে পারে কাচের রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ বর্জ্য রং ও মানের ভিত্তিতে চূর্ণ করে, চূর্ণ কৃত কাচ বা ক্যুলেটকে গলিয়ে ছাঁচে ফেলার মাধ্যমে রিসাইকেল করে প্রয়োজনীয় নতুন কাচ দ্রব্য তৈরি করা সম্ভব। 
রাসায়নিক ও গাঠনিক ভাবে নানাবিধ ধর্মের অধিকারী হওয়ায় শিল্পক্ষেত্রে, গবেষণাগারে, যানবাহনে, অফিস আদালতে, বাসাবাড়িতে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। প্রাকৃতিক স্থিতিশীল পদার্থ যেমন বালু ও চুনাপাথর থেকে কাচ তৈরি হওয়ায় কাঁচের পাত্রের সাথে রাসায়নিক সামগ্রী কম পরিমাণে মিথস্ক্রিয়া হয় এবং নিরাপদে পুনরায় ব্যবহার করা যেতে পারে, উদাহরণস্বরূপ রিফিনিয়েবল পানির বোতল। তাই বর্তমানে রাসায়নিক শিল্পে এবং ঔষধ শিল্পে কাচের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভাবে লক্ষ্য করা যায়। স্বচ্ছ, বায়ুরোধী, সুলভ কাঁচামাল, নিম্ন মূল্য এবং একাধিক বার ব্যবহারযোগ্য হওয়ার কাচ পণ্যসামগ্রীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে কাচের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সাথে বাড়ছে কাচ জাতীয় বর্জ্যরে পরিমাণ। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, এখন বাংলাদেশে প্রতি বছর কাচের ব্যবহার বাড়ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে। দেশে এখন প্রায় সরকারি বেসরকারি ৯ টি কাচ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে, এর মধ্যে নাসির গ্ল¬াস ইন্ডাস্ট্রি, পিএইচপি ফ্লোট গ্ল¬াস ইন্ডাস্ট্রি, উসমানিয়া গ্ল¬াস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড, এমইবি গ্ল¬াস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, দ্য বেঙ্গল গ্ল¬াস ওয়াকর্স লিমিটেড অন্যতম। কিন্তু শিল্প প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কাচ উৎপাদনের জন্য বিশেষ সিলিকা বালি বাংলাদেশে অপ্রতুল। বাংলাদেশের শেরপুর জেলার বালিজুরীতে, হবিগঞ্জ জেলার তেলিপারা ও শাহজিবাজারে, কুমিল্লা জেলার চৈদ্দগ্রাম উপজেলায় এবং চট্টোগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলায় কাচবালির মজুদ আছে। কিন্তু তার পরিমাণ মাত্র কয়েক মিলিয়ন টন। কাচ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে কাঁচামালের ব্যবহার হ্রাস করা সম্ভব। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ ৯৫% পর্যন্ত কাঁচামাল ধারন করে। আর এই পুনরূদ্ধারকৃত কাচ হতে পারে নতুন কাচের প্রাথমিক উপাদান।  
কাচের বোতল এবং পাত্র গুলো ১০০% পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং বিশুদ্ধতা বা মানের কোনও পরিবর্তন ছাড়াই অবিরাম পুনর্ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি কাচ সামগ্রী ল্যান্ডফিলে পাঠানো হলে তা বিশ্লেষিত হতে এক মিলিয়ন বছর সময় নিতে পারে। বিপরীতক্রমে, পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একটি নতুন কাচের পণ্য তৈরি করতে ৩০ দিনেরও কম সময় লাগে। শিল্প খাতে, সমস্ত পুনর্ব্যবহৃত কাচের ৮০ শতাংশই নতুন কাচের পাত্রে পরিণত হয়। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য ও পানীয়ের জন্য ব্যবহৃত কাচ সামগ্রী পুনর্ব্যবহারযোগ্য। উইন্ডোজ, পাইরেক্স, সিরামিক, ক্রিস্টাল ইত্যাদি অন্যান্য কাচের পণ্যগুলো ভিন্নভাবে নির্মিত হয়। যদি তা পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনযোগ্য না হয় তবে ‘সেকেন্ডারি অ্যাপ্লি¬কেশন’ এর মাধ্যমেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
কাচ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার হয়। রিসাইক্লিং কাচ নতুন কাচ তৈরি করতে কাঁচামালের ব্যবহার লাঘব করে। পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ হ্রাস হয়। নতুন কাচ তৈরি করার জন্য ২৬০০ থেকে ২৮০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। যার জন্য প্রচুর শক্তি প্রয়োজন এবং এটি গ্রিনহাউজ গ্যাস সহ অনেক শিল্প দূষণ তৈরি করে। কাচ বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন কাচ তৈরি করলে ৪০ শতাংশ তাপ শক্তি এবং দূষণ হ্রাস পায়। প্রতি ১০% ক্যুলেটের জন্য প্রায় ২-৩% শক্তির ব্যবহার হ্রাস পায়। নতুন কাচ উৎপাদনে কাচ বর্জ্য ব্যবহার করায় কার্বন নিঃসরণ ২০%  থেকে ৫০% এর মতো হ্রাস পেয়েছে।  উৎপাদন প্রক্রিয়াতে ব্যবহৃত ৬ টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচের জন্য ১ টন কার্বনডাইঅক্সাইড উৎপাদন হ্রাস পায়। পুনর্ব্যবহৃত কাচের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বায়ু দূষণকে ২০% এবং পানি দূষণকে ৫০% হ্রাস করে। কাচের রিসাইক্লিং এর ফলে বায়ুমন্ডলে ক্ষতিকর উপাদানের নির্গমন ৮%, সালফার অক্সাইড নির্গমন ১০% এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন ৪% হ্রাস পায়।  রিসাইক্লিং করার মাধ্যমে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যরে পরিমাণ কমে যায়, ফলে ল্যান্ডফিলের ধারণক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
সাম্প্রতিক সময়ে সারা পৃথিবীতেই কাচ জাতীয় বর্জ্য রিসাইক্লিং এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্ল¬াস প্যাকিং ইনস্টিটিউট অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছরে ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কাচ নিষ্পত্তি করা হয়, যার ৩৩% বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য। ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ৩৯.৩% বিয়ার এবং কোমল পানীয়ের বোতলগুলি পুনর্ব্যবহারের জন্য উদ্ধার করা হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইপিএ অনুসারে, ৩৯.৯% ওয়াইনের বোতল এবং ১৫% খাবার এবং কাচের অন্যান্য জারগুলো পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। মোট, কাচের সমস্ত খাবার এবং পানীয়ের পাত্রের ৩৩.১% পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। অপরদিকে, চীন, জাপান এবং সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ অন্যান্য এশীয় ও ইউরোপীয় অঞ্চলে প্রায় ৯০% কাচ রিসাইকেল করা হয়। বিভিন্ন উন্নত দেশসমূহে কাচ রিসাইক্লিং ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার কাচের বাজার আছে। প্রতিবছরই এসব কাচের চাহিদা বাড়ছে। তাই চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে দেশেই এখন কাচ উৎপাদন করা হচ্ছে। আর এই কাচ উৎপাদনের কাচামালের সিংহভাগ অংশ হিসেবে নির্ভরযোগ্যতা বাড়ছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ বর্জ্যরে। বর্তমানে বাংলাদেশে শহর, বন্দর, পৌর এলাকা এমনকি প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও ফেরিওয়ালারা ভাঙ্গা কাচ সামগ্রী সংগ্রহ করে রিসাইকেল কেন্দ্রে যোগান দিচ্ছে। এসব কাচ বর্জ্য রিসাইকেল করে নতুন কাচ দ্রব্য তৈরি করা হচ্ছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ তার কাঁচামাল উপাদানগুলির চেয়ে কম তাপমাত্রায় গলে যায়। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদেরও সংরক্ষণ হচ্ছে। প্রতি টন কাচের রিসাইক্লিং প্রক্রিয়াতে ১.২ টনেরও বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা যায়। কাচের পুনর্ব্যবহার পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখছে।
বর্জ্য নিয়ে দুটি কথা প্রচলিত আছে। প্রথমটি হলো, আজকের বর্জ্য আগামী দিনের সম্পদ। আর দ্বিতীয়টি হলো, আবর্জনাই নগদ অর্থ। তারই প্রমাণ পাওয়া যায় কাচ জাতীয় বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে। পুনর্ব্যবহার করলে একদিকে বর্জ্য কম তৈরি হবে এবং অন্যদিকে বর্জ্যগুলোকেই আবার ব্যবহার উপযোগী করা যাবে। এতে শুধু পরিবেশের উপকারই হবেনা বরং এর দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নতি ও বেকারত্ব হ্রাস করা সম্ভব হবে। কাচ সামগ্রীর পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব, সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও অপচয় রোধ করা করা সম্ভব, অর্থ ও জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব এবং উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব। কাচ রিসাইক্লিং সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই একবিংশ শতাব্দীতে কাচের পুনর্ব্যবহার আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

আমিনা বেগম, শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ;
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ