বুধবার , ০১ ডিসেম্বর ২০২১ |

পাঠশালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও পাওয়া না পাওয়ার কথন

ইমরান হুসাইন   মঙ্গলবার , ১৯ অক্টোবর ২০২১

বুড়িগঙ্গারতীর ঘেঁষে তিল থেকে তাল স্বরুপের ন্যায় গড়ে ওঠা বিশাল এক বিদ্যাপীঠ আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।যার অবস্থান পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীরকোল ঘেঁষে। বাংলাদেশে নানা সৃষ্টিকর্মে শতশত বছরের ইতিহাসের ধারক,বাহক ও জনক এই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। যা তিল থেকে শুরু হলেও এখন বিশালআকৃতির তাল রুপে পরিনত হয়েছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়টি দুত্যি ছড়াছে বাংলাদেশ পেরিয়েপুরোবিশ্বে। কথাটা এজন্যই বলা যে,শুরুটা ছোট্ট একটাপাঠশালা দিয়ে হলেও কালের বিবর্তনে পরিনত হয়েছে শিক্ষা সীমার সর্বোচ্চ স্থানেবিশ্ববিদ্যালয় রুপে।বাংলাদেশে আজ যতগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার মধ্যেগৌরবের সহিত মাথা উঁচু করে অন্যতম একটা স্থান দখল করে আছে এই জগন্নাথবিশ্ববিদ্যালয়।ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের সহিত দুর্বারগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই জগন্নাথ  বিশ্ববিদ্যালয়।যে বিশ্ববিদ্যালয়টি গৌরব ও সাফল্যের সহিত পথ চলার ষোলো বছর অতিক্রম করে সতেরোতে পদার্পণ করেছে। কিন্তু এই গৌরব ওসাফল্যের মাঝেও আছে নানাবিধ সংকট।তবুও সব সংকট উপেক্ষা করেই এগিয়ে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

 

আজ২০ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। দীর্ঘ ষোলো বছর পেরিয়ে সতেরো  বছরে যাত্রা শুরুকরলো নতুন উদ্যমে সংকটকে মেনে নিয়ে সাফল্য ও সম্ভাবনাকে পুজি করে। তবে আমরাবর্তমান সময়ে যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দেখছি,যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মাথা উঁচু করে হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের গর্বের সহিত বাঁচতেশেখায়।যার হুংকারে কেঁপে ওঠে রাজপথ,যার পরিচয়ে গর্ববোধকরে হাজার হাজার  শিক্ষার্থী ও তার পরিবার।সব সময়অন্যায় অবিচাররে প্রতিবাদে সোচ্চার সেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় একদিনে বা পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠা হয় নি। যেকারণে আছে আমাদের নানামুখী সংকট। সনামধন্য আজকের এইজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টির পেছনে আছে বিশাল এক গল্প।ইতিহাস বলে, উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে যাত্রা শুরু হয়ব্রাহ্ম স্কুল নামের একটি পাঠশালার। ব্রাহ্ম আন্দোলনের নেতা দীননাথ সেন, অনাথবন্ধু মৌলিক, পার্বতী চরণ রায়, ব্রজসুন্দর মিত্র প্রমুখের ঐকান্তিক চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় এইস্কুল।উচ্চমানের পার্থিব শিক্ষার সঙ্গে ব্রাহ্ম ধমের্র মূল মতবাদ সম্পর্কে সাধারণছাত্রদের জানানোর জন্য আরমানিটোলায় ব্রাহ্ম সমাজের নিজস্ব প্রাঙ্গণে চালু করা হয়এই অবৈতনিক স্কুল। ব্রাহ্ম স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে।তবে প্রতিষ্ঠাতা অনাথবন্ধু মৌলিক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারের তথ্যমতে১৮৫৮ সালকে সঠিক হিসাবে ধরা হয়।আর্থিক সংকটের কারণে ১৮৭২ সালে মালিকানা পরিবর্তনকরে ব্রাহ্ম স্কুলের ভার তুলে দেওয়া হয়েছিল বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায়চৌধুরীর হাতে। তখন জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী ব্রাহ্ম স্কুলের নাম পরিবর্তন করেতাঁর বাবা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে জগন্নাথ স্কুল নামকরণ করেন। এরপর থেকেইজগন্নাথ স্কুলের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৪ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণিরকলেজ এবং ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজের মর্যাদা লাভ করে। এর পর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়প্রতিষ্ঠিত হলে এ সময় স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অবনমন করা হয়জগন্নাথ কলেজকে। ১৯৪৯ সালে এ কলেজে আবারও স্নাতক পাঠ্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৩ সালেঅধ্যক্ষ সাইদুর রহমান পুনরায় কো-অ্যাডুকেশন চালু করেন। এর আগে ১৯৪২ সালেকো-অ্যাডুকেশন চালু হলেও ১৯৪৮ সালে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।১৯৬৮ সালে পাক সামরিকবাহিনী জগন্নাথ কলেজকেন্দ্রিক স্বাধিকার আন্দোলনকে দমানোর জন্য জগন্নাথ কলেজকেসরকারিকরণ করে শুধু বিজ্ঞান কলেজে রূপান্তরিত করে। এর বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগকেসরিয়ে মহাখালীতে নতুন জিন্নাহ কলেজ খোলা হয় (বর্তমান তিতুমীর কলেজ)। এর পরে ১৯৭২ সালেজগন্নাথে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু হয়। সে সময় দেশের অন্য অনেক কলেজের মতো এইকলেজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯২ সালে জাতীয়বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৯১-১৯৯২ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েরঅধীনে শিক্ষাকার্যক্রম চলতে থাকে।পরে জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে২০০৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৮ম জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়আইন ২০০৫ সংসদে উত্থাপিত হয় এবং ২০ অক্টোবর একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়।সেই থেকে আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে পাওয়া।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে আপন করেনেওয়া, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে মনের গভীরে লালন করা। আরএই বিশ্ববিদ্যালয়টিই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠাতার ষোল বছর পেরিয়ে গৌরব, ঐতিহ্য ,সাফল্যে, সংকটও নতুন সম্ভাবনা সামনে রেখে সাথে সতেরোতে যাত্রা শুরু করলো ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক জগন্নাথবিশ্ববিদ্যালয়। 

 

প্রতিষ্ঠাতারষোল বছর অতিক্রম করে সতেরো বছরে পদার্পণ করলেও  আমাদের আছে অনেক সীমাবদ্ধতা এবং বহুমুখী সংকট, আবাসন সংকট,চিত্ত বিনোদনের স্থানের সংকট,খেলার মাঠ,সহ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগতঅপূর্ণতা। তবুও শত বাধা, শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এগিয়েযাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেনিজেদের জানান দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে জবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। শুরু থেকেইবিশ্ববিদ্যালয়টির সব বিভাগে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু রয়েছে। অনেক আগেই ইউজিসিরপ্রতিবেদনে এ-গ্রেডভুক্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করেছে এইপ্রতিষ্ঠানটি। বিসিএসসহ সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরিকরেছে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ভর্তি পরীক্ষাতে গোপন বার-কোড পদ্ধতি চালুকরার মাধ্যমে জালিয়াতি রোধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।এবংভর্তি পরীক্ষার খাতা সঠিক মূল্যায়ন ও সেরা মেধা যাচাইয়ের জন্য দেশে প্রথম লিখিতপরীক্ষা চালু করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। এবং ভর্তি পরীক্ষাতে পরীক্ষার্থীদের কষ্টলাঘব করতে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার যাত্রায় সিংহভাগ অবদান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের।  

 

সনামধন্যএই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলতে হয় নানা প্রতিবন্ধকতার ভিতরদিয়ে।লড়াই করে বাঁচতে হয় প্রতিটা মুহূর্তে। কেননা দেশের একমাত্র অনাবাসিকবিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে ক্ষ্যাত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও অনাবাসিক তকমা ঘুচতেচলেছে খুব দ্রুতই, একমাত্র ছাত্রী হলবেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাত্রী হলের আনুষ্ঠানিক যাত্রার মাধ্যমে। তবে প্রতিষ্ঠারষোল বছর পূর্ণ হলেও নেই ছাত্রদের জন্য নেই কোন আবাসিক ব্যবস্থা।ফলে পুরান ঢাকারনোংরা ও গিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।

 

তবুওনানা রকম প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,হল সমস্যা,বাস সমস্যা,গ্রন্থগারের সমস্যা,পরিসরের স্বল্পতা সব কিছুকাটিয়ে সামনের দিকে বেগবান গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় একের পর এক জাতীয়ও আন্তর্জাতিক অর্জনে ভূষিত হচ্ছে।যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহসাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোও বেশ অবদান রেখে চলেছে। মুল শিক্ষার পাশাপাশি সহ-শিক্ষাকার্যক্রমগুলোতে দ্যুতি ছড়াচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়েরশিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ স্থানঅধিকার করে নিচ্ছে ক্রিকেট,ফুটবল,ক্যারাতে,বিতর্কসহ জাতীয় পর্যায়ে সেরা স্থানদখল করছে তরুণ লেখকদের সংগঠন বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম জগন্নাথবিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসপুলে নতুন বাসের সংযোজন, গ্রন্থগারের সমস্যার সমাধান।এবং প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পর ১১ জানুয়ারি২০২০-এ প্রথম সমাবর্তন হয়েছে। যা আমাদের নিকট স্মরণীয়। 

 

অবকাঠামোহীনএই বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুনত্বে সাজাতে ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাঅনুযায়ী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের কাজে ভূমি অধিগ্রহণেরজন্য ৮৯৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন।যেখানে ১৮৮.৪ একর জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। 

ওইপ্রকল্পের কাজ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ে দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।এটি আমাদের জন্য অনেকবড় সম্ভাবনা বিষয়। একটি সুখকর বার্তা। নতুন ক্যাম্পাসেপরিপূর্ণ ভাবে রুপ নিবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পাঠশালা থেকে গড়ে উঠা আজকের এইজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সমস্ত বাধা অতিক্রম করে শিক্ষা- সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সমস্তদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যঅধ্যাপক ড.ইমদাদুল হক স্যারের পরিশ্রম, বিচক্ষনতা ও দূরদর্শী প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলেছে দূর্বার গতিতে।শিক্ষার্থীদের প্রতি উপাচার্যের সুদৃষ্টি, বিশ্ববিদ্যালয়কেএগিয়ে নিবে আরো একধাপ। উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার রোল মডেল হিসাবে খুব দ্রুতই বিকাশ লাভকরবে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা সেই  ছোট্টপাঠশালাটি যার বর্তমান নাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। যার সুনাম ও সাফল্য ছড়িয়ে পড়েছেএক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে অন্ধকার সমাজকে আলোকিত করে এগিয়েযাক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।দীর্ঘ ষোল বছরের ঐতিহ্য,গৌরব ওসাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখে, মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাকজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ