শুক্রবার , ১৯ আগষ্ট ২০২২ |

অনলাইন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী

  মঙ্গলবার , ২৬ July ২০২২

মোহাম্মদ নূরুল হক : গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ মনে করা হতো মাত্র ক’দিন আগেও। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যম আছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ গণমাধ্যমের কাজ হলো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি জনমত গঠন করা। অথচ এই সময়ের সংবাদমাধ্যম গণরুচির জোগান দিচ্ছে। 

সেই গণরুচির ‘রুচি’ নিয়েও প্রশ্ন আছে। ইতোমধ্যে ছাপানো কাগজ অর্থাৎ দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন ও রেডিওর পাশাপাশি চলে এসেছে অনলাইন গণমাধ্যমও। নতুন এই প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকতায়ও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন কতটা রুচিশীল, কতটা স্বাস্থ্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন উঠছে, রুচির জোগান দেওয়া এই অনলাইন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী?

মানুষ আসলে কী জানতে চায়? মানুষ জানতে চায়, তথ্য। সেই তথ্যকে হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ। চটকদার-চটি তথ্যে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণরা সুড়সুড়ি অনুভব করতে পারে, কিন্তু তাতে দেশ-জাতির কোনো উপকার হয় না। অবশ্যই বর্তমান সময়ে অনেক প্রাপ্তবয়স্কেরও সেই সুড়সুড়িসর্বস্ব তথ্যের জন্য ‘লালা’ ঝরে। এই ‘লালাঝরা’ প্রাপ্তবয়স্করাও মানসিক দিক থেকে সেই সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণদেরই সমগোত্রীয়। আর বেশিরভাগই বিকারগ্রস্ত।


এখন প্রশ্ন হলো, অনলাইন গণমাধ্যমগুলো কী করবে, সমাজ-রাষ্ট্রকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দেবে, না বিকারগ্রস্তদের রুচির জোগান দিয়ে হিট বাড়াবে? যদি সুড়সুড়ির জোগান দেওয়া ও হিটই লক্ষ্য হয়, তাহলে এত এত গণমাধ্যমের প্রয়োজন কী। এসব সুড়সুড়ি তো আদিম প্রবৃত্তিরই অংশ। সে বিষয়গুলো তো চির পুরাতন, আবার চির নতুনও। তাই এসব সুড়সুড়িসর্বস্ব কন্টেন্ট একবারই প্রকাশ করলে অনলাইনে যুগ-যুগ ধরে চলবে। একই কন্টেন্ট বিকারগ্রস্তরা প্রতিদিনই একবার আধবার পড়বে। যখনই সুড়সুড়ি জাগবে, তখনই ঢুঁ মারবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অনলাইন গণমাধ্যম কি কেবলই এই সুড়সুড়ির জোগান দেবে? তাহলে রুচি-বিবেক বলে কী থাকলো?

এই কথা কে না জানে, গণমাধ্যমের প্রধান দুটি কাজ হলো, তথ্য সরবরাহ ও জনমত গঠন করা। দেশ ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রকৃত তথ্য দিয়ে সাহায্য করা। বিশেষ বিশেষ সময়ে জনগণের মঙ্গলার্থে জনমত গঠন করাও গণমাধ্যমের কাজ। তাহলে সুড়সুড়ি সর্বস্ব কন্টেন্ট প্রকাশ করে অনলাইনগুলো যে ধরনের রুচি গড়ে তুলছে, তাতে জনমত কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে? রুচিশীল ও মাঙ্গলিক কোনো ইস্যুতে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। এর কারণে অনলাইন গণমাধ্যমগুলোয় সেই রুচিশীলতার চর্চাই নেই। 

রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চেয়ে এই সময়ের সংবাদে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, কোন নায়িকা কী ধরনের পোশাক পরেন, কোন নায়িকা কার সঙ্গে লিভটুগেদার করছেন এই সব তথ্য। সানি লিওনি, মিয়া খলিফার গ্রুপ সেক্স, নায়ক-নায়িকার রোমান্স-ঘরবাঁধা-ঘরভাঙার রগড় কাহিনিতে অনলাইনগুলোর ৯৫ ভাগ যদি ভরে যায়, রুচিশীল পাঠক তো মুখ ফিরিয়ে নেবেই।


যে গণমাধ্যমকে একসময় ‘স্টোর হাউজ অব নলেজ’ বলা হতো, সেই মাধ্যমে আজ কী ধরনের নলেজ পাওয়া যাচ্ছে। যে ধরনের নলেজের দেখা মিলছে, তার জন্য রুচিশীল পাঠকরা কোনোভাবেই প্রস্তুত নন। গণমাধ্যমকে ‘স্টোর হাউজ অব নলেজ’ থেকে যারা দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন, তারা হয়তো বাণিজ্য বোঝেন, কিন্তু মানবতা, রুচি, সৌন্দর্য সম্পর্কে তাদের তিলমাত্র ধারণা নেই। তারা জ্ঞান-শিল্পচর্চার বিপরীতে বর্বরতা, হিংস্রতা, বেলেল্লাপনা ও প্রায়-পর্নগ্রাফির চর্চা করছেন।

কিন্তু এসব গণমাধ্যমের কর্তারা ভেবে দেখছেন না,পর্নোগ্রাফির নেতিবাচক প্রভাব কত ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্নো-আসক্তি মানুষের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। এছাড়া নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মায়। সবচেয়ে বড় কথা, পর্ন-আসক্তরা সমাজে ধর্ষণ ও যৌন-হয়রানির মতো অপরাধে দ্রুত জড়িয়ে পড়ে। অথচ যারা সরাসরি পর্ন মুভি দেখা বা গল্প পড়ার সুযোগ পায় না, তারা বর্তমানের তথাকথিত ও হিটকামী অনলাইনগুলো থেকে প্রায়-পর্ন গল্প ও কাহিনি পড়ে যৌন-হয়রানি ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। যদি এমনটা হয়, তাহলে এর দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্ট অনলাইন গণমাধ্যমের মালিক ও কর্তাব্যক্তিরা।

গণমাধ্যমকে ‘পর্নবার্তা’র দিকে পর্যবসিত করার পেছনে যারাই থাকুক, দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের এখনই সতর্ক না হলে ভবিষ্যৎ পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। মানুষ অনলাইন গণমাধ্যম বলতে আর সংবাদমাধ্যম বুঝবে না, ধরে নেবে ‘পর্নবাতার সাইট’ ও ‘স্বাস্থ্যবার্তা’র অনলাইন। ফলে তারা নিউজ পোর্টালগুলোয় আর রাজনীতি-অর্থনীতি, শিক্ষা, দর্শন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশ্ব-রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞান, খেলাধুলার সংবাদ খুঁজবে না। এসব সংবাদ যদি নিউজ পোর্টালগুলো থাকেও, তবু পাঠক মুখ ফিরিয়ে নেবে। তারা ধরে নেবে, পাদপূরণের অংশ হিসেবে এসব সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে।


এই সময়ের সবচেয়ে বড় হাস্যকর ব্যাপারটি এমন, অধিকাংশ গণমাধ্যমের কর্ণধার ও কর্তাব্যক্তিরা নিজের প্রতিষ্ঠানটিকে দেখতে চান, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে। কিন্তু নিজেদের গণমাধ্যমের সিংহভাগ ভরিয়ে রাখেন হিট-সুড়সুড়িসর্বস্ব খবরে। তারা হয় জানেন না, না হয় মানেন না, সুড়সুড়িসর্বস্ব সংবাদ দিয়ে রুচিশীল পাঠকের মন জয় করা যায় না। পাঠকহৃদয় জয় করতে না পারলে মর্যাদার আসনেও আসীন হওয়া যায় না। বিষয়টি অনেকটা এমন, কোনো এক ব্যক্তি চান, তার মাথা হিমালয়েরও ওপরে থাকুক। কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন সমতলের চেয়ে বিশ ফুট নিচের মলভাণ্ডে। যেখান থেকে তার মাথা সমতলবাসীও দেখে না। আর মলভাণ্ডের দুর্গন্ধে কেউ তার কাছেও ঘেঁষতে পারে না। 

উদাহরণটুকু এজন্য টানলাম যে, কেউ যদি তার গণমাধ্যমকে মর্যাদাপূর্ণ আসনে দেখতে চান, তাহলে হিমালয়ের মতো উঁচুতে স্থাপন করতে হবে। মর্যাদাপূর্ণ-রুচিশীল-জনস্বার্থশ্লিষ্ট সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। সুড়সুড়িকে বিদায় দিতে হবে। এতে আপাত হিট কিছুটা কমবে, কিন্তু তারা যেখানেই যাবেন বুক ফুলিয়ে ও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন। কিন্তু হিট-হিট করে সুড়সুড়িসর্বস্ব টিপস প্রকাশ করলে নিজে নিজে স্বমেহনে যতই মগ্ন থাকুন, রাস্তায় বের হলে মাথাটা হেঁট করেই হাঁটতে হবে। উঁচু করে হাঁটতে গেলেই কাকের বিষ্টা এসে তাদের মাথায় পড়বেই। সেটা কেউ ঠেকাতে পারবে না। অতএব, সময় থাকতে কৌশল পরিবর্তন করুন। না হয়, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’।

লেখক: কবি-প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক

 মুক্তবাক থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ