মঙ্গলবার , ২৯ নভেম্বর ২০২২

প্রাথমিক শিক্ষায় অভিন্ন পাঠ ও সূচি থাকা জরুরি

দেশকাল অনলাইন   বুধবার , ২৩ নভেম্বর ২০২২

ঢাকা : দেশে মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রাথমিক শিক্ষা সব শিক্ষাস্তরের ভিত্তি সৃষ্টি করে বলে যথাযথ প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।

প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগ-অনুভূতির বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশপ্রেম, বিজ্ঞানমনস্ক, সৃজনশীল ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা।

শিশুর মধ্যে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা। শেখার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির মাধ্যমে শিশুর কল্পনা শক্তি, সৃজন ও নান্দন বোধের উন্মেষে সহায়তা করা। বিজ্ঞানের নীতি-পদ্ধতি ও প্রযুক্তির জন্য জ্ঞান অর্জন, তার ব্যবহার এবং বিজ্ঞানমনস্ক ও অনুসন্ধিৎসু করে গড়ে তুলতে সহায়তা করা। ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশ এবং নিজেকে প্রকাশ করতে সহায়তা করা। গাণিতিক ধারণা, যৌক্তিক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করা। সামাজিক ও সুনাগরিক হওয়ার গুণাবলী এবং বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে সহায়তা করা। ভালো-মন্দের পার্থক্য অনুধাবনের মাধ্যমে সঠিক পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করা। অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, পরমত সহিষ্ণুতা, ত্যাগের মনোভাব ও মিলেমিশে বাস করার মানসিকতা সৃষ্টি করা। প্রতিকূলতা মোকাবিলার মাধ্যমে শিশুর আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করা। নিজের কাজ নিজে করার মাধ্যমে শ্রমের মর্যাদা উপলব্ধি ও আত্মমর্যাদা বিকাশে সহায়তা করা। প্রকৃতি, পরিবেশ ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জানতে ও ভালোবাসতে সহায়তা করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করা। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে সচেষ্ট করা। জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ধুদ্ধ করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভালোবাসতে সাহায্য করা।

সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন করে তোলার জন্য সার্বিক উৎসাহ প্রদান করে চলেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন এবং ৩৬০১৫টি বিদ্যালয় সরকারি করা হয়। ২০১৩ সালে তৎকালীন ২৫২৪০টি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করে। বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন যুগোপযোগী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। যার সুফল প্রাথমিক শিক্ষার সর্বস্তরে প্রতিফলিত হচ্ছে। এছাড়াও সরকার বর্তমানে দেশে বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যালয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার চাহিদা পূরণে সহায়তা করে চলছে।

দেশে প্রাথমিক স্তরে দুইটি উপ ধারা রয়েছে। একটি হলো সাধারণ ও অপরটি ধর্মীয় মাদ্রাসা শিক্ষা। এসব নিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানে বিভিন্ন রকমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যথা- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়, এবতেদায়ী মাদ্রাসা, দাখিল মাদ্রাসা ও সংশ্লিষ্ট এবতেদায়ী মাদ্রাসা, এনজিও স্কুল, পরীক্ষণ বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন স্কুল (ইংরেজি মাধ্যম প্রাথমিক বিদ্যালয়), স্যাটেলাইট স্কুল, কমিউনিটি স্কুল, মন্দির ও মসজিদভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা।

অনেক এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যাপ্ত সংখ্যায় নেই। সেই সমস্ত এলাকায় বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো এগিয়ে এসেছে। এতে ঝড়ে পড়ার হার কমেছে শিক্ষিতের হার বেড়েছে। তবে বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে প্রাথমিক স্তরে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক ও অভিন্ন বিষয় এবং পাঠ্যসূচি প্রবর্তন করা প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন ধারা যথা-সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন (বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম), ইবতেদায়ীসহ সব ধরনের মাদ্রাসার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। নির্ধারিত বিষয়সমূহ ছাড়া অন্যান্য নিজস্ব কিংবা অতিরিক্ত বিষয় প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া সন্নিবেশ করা যাবে না।

বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে পাঁচবছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা এবং প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। বিভিন্ন ধরনের (কমিউনিটি বিদ্যালয়, রেজিস্ট্রিকৃত নয়, এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ ও শহরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে যে সুযোগ সুবিধার বৈষম্য বিরাজমান তা দূরীকরণের লক্ষ্যে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সাধারণ, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম এবং সব মাদ্রাসা ও সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নিয়ম মেনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন করতে হবে।

প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষাক্রম, শিক্ষক নির্দেশিকা ও শিক্ষক সহায়িকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা এবং বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যালয়সূহে অতিরিক্ত পাঠ্যপুস্তক পড়ানো থেকে বিরত রাখার সার্বিক ব্যবস্থা তদারকি করা। শিখন-শেখানো কার্যক্রম ও সমন্বয় থাকা বাঞ্চনীয়। শ্রেণি ব্যবস্থাপনার দিকে খেয়াল রাখা। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে আকর্ষনীয় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে শিখন-শেখানো কার্যক্রমকে আরো বেগবান করা। প্রাথমিক পর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য শিক্ষাক্রম বিস্তরণসহ শিখন-শেখানো কার্যক্রমের উপর ফলপ্রসু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। (যেমন-পিটিআই অথবা বিভিন্ন উপজেলা/থানা রিসোর্স সেন্টারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া)।

বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী, সুধীজন, সরকারি কর্মকর্তাগণ কর্তৃক সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সমন্বয়ে আলোচনা সভার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যাতে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের স্কুলটি আরো বন্ধুত্বপূর্ণ ও দৃঢ় হয় এবং আলোচনা সভায় সরকারের নতুন নতুন কার্যক্রম কর্মসূচি অবহিত করা বাস্তবায়নের দিক নিয়ে পারস্পরিক মতবিনিময় করা।

পরীক্ষা পদ্ধতি অভিন্ন এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকা উচিত। সরকারি পরিকল্পনায় বর্তমানে মূল্যায়ন পদ্ধতি ভিন্ন হলেও কিছু কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনো মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পূর্বের মতো চলমান। এক্ষেত্রে সমন্বয় প্রয়োজন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের যোগ্যতা নির্ধারণ, নূন্যতম অবকাঠামো, উপকরণ ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রাখা।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রাথমিক শিক্ষা দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলছে। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য সরকারি বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ে সম্মিলিত প্রয়াস একান্ত প্রয়োজন।

লেখক: থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, টঙ্গী, গাজীপুর।


দৈনিক দেশকাল/জেডইউ/ ২৩ নভেম্বর, ২০২২

 মুক্তবাক থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ