বুধবার , ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

স্বদেশি বনাম বিদেশনির্ভর চিকিৎসা

দেশকাল অনলাইন   রবিবার , ২৭ নভেম্বর ২০২২

স্বাস্থ্য খাত রাষ্ট্রের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বলা হয়ে থাকে, যে দেশের জনগণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিক থেকে এগিয়ে, সে দেশ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে গতিশীল। মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসাসেবা অন্যতম একটি মৌলিক অধিকার। সরকারকে এ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ তারা রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেন না, চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করেন, আয় বাড়ানোর জন্য একগাদা টেস্ট ও ওষুধ ধরিয়ে দেন ইত্যাদি ইত্যাদি। পেশাদার সৎ ও মানবিক চিকিৎসক যে নেই, তাও নয়; তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল এবং তারাও চিকিৎসক নামের এক ধরনের কসাইদের কাছে জিম্মি। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশ গমন করেন এবং তুলনামূলক কম খরচে সুচিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরত আসেন।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোট যে ব্যয় হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশই আসে নাগরিকদের নিজের পকেট থেকে। এটা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক দশকের ব্যবধানে স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তি খরচ দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখতে না পেরে অনেকে বিদেশে গিয়ে এসব রোগের চিকিৎসা নিচ্ছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব প্রাইভেট হসপিটালসের এক তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতি বছর পাঁচ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। শুধু গত বছর যেসব মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বাইরে গেছে, তাদের শুধু চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই যায় ভারতে। এছাড়া প্রতিটি রোগীর ভ্রমণ, থাকা, খাওয়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয় রয়েছে।

রোগীরা মূলত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অদক্ষতা ও আস্থার সংকটে বিদেশে যাচ্ছে। চিকিৎসার জন্য ভারত ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে যাচ্ছে।

‘কি রিজনস ফর মেডিকেল ট্রাভেল ফ্রম বাংলাদেশ টু ইন্ডিয়া’ শীর্ষক এক গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশের কোনো শ্রেণিপেশার মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে বেশি যাচ্ছে তা-ও উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে দেখা যায় ব্যবসায়ী, বেসরকারি চাকরিজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা বেশি যাচ্ছেন ভারতে। এতে বলা হয়, এই মানুষদের বেশির ভাগই বলেছে, ডাক্তার ও নার্সিংসেবা ভালো পায় বলে তারা সেখানে যায়। দেশে কেন চিকিৎসা করাচ্ছেন না এমন প্রশ্নে তারা বলেছেন, দেশে চিকিৎসকদের প্রতি তাদের আস্থা কম। কারণগুলোর মধ্যে এরপরই আছে অপর্যাপ্ত হাসপাতাল, রোগীর নিরাপত্তা এবং সবার পরে খরচের বিষয়টি। ভারতে মেডিকেল ট্যুরিজমের ৫৫ শতাংশই বাংলাদেশি। গত তিন বছরে মেডিকেল ট্যুরিজমে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিরা মূলত ভারতের কলকাতা, নয়াদিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ ও মুম্বাই শহরে বেশি যাচ্ছে।

আমরা জানি, জাতীয় বাজেটে দেশের চিকিৎসা খাতে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়। যারা সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে পড়াশোনা করছে সাধারণ মানুষের করের টাকায় তাদের পড়াশোনার ৯৫ শতাংশই অর্থের জোগান দেওয়া হয়। দেশের সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পেছনেও ব্যয় করা হয় বিপুল অর্থ। তারপরও দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে চিকিৎসা খাত কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে তা একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। দেশে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে উদারভাবে বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক এমনকি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনে সরকারিভাবে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এত কিছুর পরও চিকিৎসাব্যবস্থায় চলছে চরম নৈরাজ্য। সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থায় অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বেসরকারি চিকিৎসা খাত সেবার বদলে বাণিজ্যিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

দেশের চিকিৎসকদের বেশির ভাগই ওষুধ কোম্পানির হুকুম তালিমের ভূমিকা পালন করছে। রোগীদের কাছ থেকে বড় অংশের ফি নিয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারছেন না। ওষুধ কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশন করার নামে তাদের কাছ থেকেও গ্রহণ করছেন বড় অঙ্কের টাকা। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সঙ্গে চিকিৎসকদের অলিখিত চুক্তি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা কমিশনের লোভে যেসব বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার নেই সেসব বিষয়ে পরীক্ষার জন্যও রোগীদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য করছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক থাকায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো যেনতেনভাবে রিপোর্ট দিয়েই খালাস। বাংলাদেশের এসব পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এমনকি ভারতে গেলে সে দেশের চিকিৎসকরা হাসাহাসি শুরু করেন। সোজা কথায় চিকিৎসার নামে বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রেই চলছে মহাপ্রতারণা। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য জাতীয় বাজেটে যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে তা আদতে খুব একটা কাজে লাগছে না।

জনস্বার্থে এসব বিষয়ে সরকারকে কুম্ভকর্ণের ঘুম থেকে জাগতে হবে। চিকিৎসাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। কালের বিবর্তনে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাণিজ্য প্রাধান্য পাওয়ায় এর মানবিক উপাদানগুলো নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশের সংবিধানে স্বাস্থ্য বা চিকিৎসাকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গত চার দশকে দেশে বিপুলসংখ্যক সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে আরো মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতে হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আশা করা হয়েছিল চিকিৎসাসেবাকে মানবিক পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে এসব খাতের উদ্যোক্তারা ভূমিকা রাখবেন। বেশকিছু বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এ ক্ষেত্রে যথার্থ ভূমিকা পালন করলেও বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলেই মনে করা হয়।

সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে সে ব্যবস্থা অপ্রতুল। এ সুযোগে দেশজুড়ে গজিয়ে উঠেছে গত ২০ বছরে সরকার অনুমোদিত ও অননুমোদিত অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অধিক ব্যয়সাপেক্ষ এসব বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ তেমন সেবা পাচ্ছে না। বরং সেবার নামে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিক অর্থ আদায়, প্রতারণা, ভুল চিকিৎসা এবং জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সরকারের তথ্য বলছে, উপজেলা হাসপাতালে পদ থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ পদ খালি থাকে। স্থানীয়ভাবে শূন্যপদগুলোতে সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব, অনেক দেশেই এ ব্যবস্থা আছে। হাসপাতালের ভর্তি রোগীরা প্রায় সব ওষুধ বিনা পয়সায় পেয়ে থাকে কিন্তু বহির্বিভাগ রোগীদের জন্য ওষুধ বরাদ্দ নেই বললেই চলে। এছাড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিষেশায়িত হাসপাতালে অনেক বেশি রোগীর ভিড় থাকায় রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ উপজেলা হাসপাতালে রোগীরা ডাক্তার পায় না, ঠিকমতো ওষুধ পায় না, ফলে তারা জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আসতে বাধ্য হয়। একসঙ্গে অনেক রোগীর ভিড় থাকায় এসব হাসপাতাল মানসম্মত চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলো চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত করতে পারলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ রোগীর মানসম্মত চিকিৎসা জেলা/উপজেলা হাসপাতালে দেওয়া সম্ভব।

গত ৫০ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ হচ্ছে ‘অব্যবস্থাপনা’। সত্যিকার অর্থেই দেশে পেশাদার একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তৃণমূল থেকে যত ওপরে যাওয়া যায় সর্বত্রই একই দৃশ্য প্রতীয়মান হয়। আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হচ্ছে, জিডিপির পাঁচ শতাংশের মতো অর্থ স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া। বাংলাদেশে এক যুগের অধিককাল ধরে বাজেটে জিডিপির এক শতাংশের কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থেরও কম-বেশি ৭০ শতাংশ বেতন-ভাতা ইত্যাদির মতো খাতে খরচ হয়। বাকি অর্থ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ব্যবহৃত হওয়ার কথা যা নিতান্তই অপ্রতুল। স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়নের কথা ভেবে এ খাতের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতিমুক্ত রেখে এ অর্থের সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন নিয়মিত গবেষণা, সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।

আমাদের দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসা কলেজ ও আধুনিক হাসপাতাল হাসপাতাল গড়ে উঠেছে কিন্তু তা থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে এ দেশ থেকে প্রতি বছর পাঁচ লক্ষাধিক লোক চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমন করে। চিকিৎসায় যে ধরনের উন্নত ও আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন তাও আমাদের আধুনিক ও উন্নতমানের হাসপাতালগুলোতে রয়েছে। আমাদের দেশের চিকিৎসকদের মান কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো অংশেই বিদেশের উল্লিখিত দেশের চিকিৎসকদের চেয়ে নিম্নতর নয়। দেশের শীর্ষ পদে আসীন কিছু ব্যক্তি, আমলা, রাজনীতিবিদ, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী এ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মোটেও আস্থাশীল নয়। শীর্ষ পদে আসীন এসব ব্যক্তিরা প্রতি বছর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দাঁত, চোখ ও কানের চিকিৎসার অজুহাতে বিদেশে গিয়ে জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ যেভাবে অপব্যয় করে চলেছেন তা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। এরা নিজ দেশে চিকিৎসা গ্রহণ না করে উদাহরণ সৃষ্টি না করায় অপরাপর ব্যক্তিরা এদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গমনেচ্ছুদের নিবৃত্ত করা গেলে আমাদের বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং এ অর্থ নিজ দেশে ব্যয় হলে তা নিঃসন্দেহে আমাদের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে। প্রশ্ন হচ্ছে কবে দেশের মানুষ দেশেই কম খরচে সুচিকিৎসা পাবে এবং এ ধরনের বিদেশনির্ভর চিকিৎসা সেবা শেষ হবে!

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

দৈনিক দেশকাল/জেডইউ/জেডআরসি/ ২৭ নভেম্বর, ২০২২

 মুক্তবাক থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ