বুধবার , ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

পাঠ্যবইয়ে ভুল : অভিযুক্তদের চিহ্নিত করতে মাঠে গোয়েন্দারা

দেশকাল অনলাইন   মঙ্গলবার , ২৪ জানুয়ারী ২০২৩

নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ভুল-ভ্রান্তি, তথ্য বিকৃতি ও ধর্মীয় উস্কানি সংশোধনসহ জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে উচ্চপর্যায়ের দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সম্পৃক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।

মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পাঠ্যবইয়ের যে ভুলগুলো চিহ্নিত হচ্ছে সেটা খুব ইতিবাচক ভাবেই দেখছি। এ ভুলগুলো শনাক্ত করতে আমরা দুটি কমিটি করছি। একটি কমিটিতে আমাদের বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। একই সঙ্গে পাঠ্যবই সংশোধনীতে একটি অনলাইন ফর্ম সরবরাহ করবে মন্ত্রণালয়। এ ফর্মে বিষয়ভিত্তিক বইগুলোর ভুল বা অসংগতি সম্পর্কে দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে অবহিত করার সুযোগ থাকবে। বিশেষজ্ঞরা নতুন করে সব বই পর্যালোচনা করবেন। বইয়ের মধ্যে যেসব ভুল চিহ্নিত হবে সেগুলো আমলে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সমাধান করবেন। সেসব সংশোধনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

অন্য কমিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি, দুই মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, এনসিটিবির প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠন করা হবে। পাঠ্যবইয়ে ভুল-ত্রুটি ও বিতর্ক উঠা বিষয়গুলো কেউ ইচ্ছাকৃত যুক্ত করেছেন কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।


শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সারাবিশ্বে কাগজ ও বিদ্যুতের সংকট থাকার পরও আমরা ১ জানুয়ারি পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম অব্যহত রেখেছি। পাঠ্যপুস্তক কেন্দ্র করে যেন কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অষ্টম শ্রেণির নতুন পাঠ্যবই তৈরিতে সতর্কতা অবলম্বন করছে এনসিটিবি। এ ক্ষেত্রে বইয়ের পাঠ নির্বাচনের পাশাপাশি লেখক এবং সম্পাদক নির্বাচনেও অবলম্বন করা হচ্ছে সতর্কতা। এবারের ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বই যারা লিখেছেন, ভবিষ্যতে এনসিটিবির আর কোনো বই প্রণয়নের দায়িত্ব তাদের না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম জানান, এ পর্যন্ত পাঠ্যবইতে যেসব ভুল চিহ্নিত হয়েছে তার সংশোধনী পাঠানো হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বইয়ে আরও ভুল আছে কি না বা সাধারণ মানুষ যেমন বই চাচ্ছে, তেমন হয়নি- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মূলত প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণির ও মাধ্যমিকের ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির বইগুলো এবার নতুন দেওয়া হয়েছে। এগুলোই পর্যালোচনা করতে দেওয়া হয়েছে শিক্ষাবিদদের কাছে। নতুন শিক্ষাক্রমে অষ্টম শ্রেণির বই কি বর্তমান ধারায় লেখা হবে, নাকি পরিবর্তন আনা হবে, সেসবও পর্যালোচনা করা হবে। এ নিয়ে সোমবার শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এ বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত বলা যাচ্ছে না।

এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, মাধ্যমিকের নতুন কারিকুলামের বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন কমিটিতে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে বেশি ছিলেন বামপন্থি শিক্ষকরা। সংশ্লিষ্ট সদস্য ছাত্র জীবনে যুক্ত ছিলেন জাসদের রাজনীতির সঙ্গে। বইয়ের লেখক প্যানেল তিনিই তৈরি করেছেন। ওই প্যানেল অনুমোদন ছাড়াই বই লেখার কাজ শুরু করে দেয়। কাজ অনেক দূর এগোনোর পর তা এনসিটিবি (বোর্ড) এবং মন্ত্রণালয়কে দেখায়। অনেক সময় চলে যাওয়ায় প্যানেলে আর পরিবর্তন আনা হয়নি।

ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরির পর তা শিক্ষামন্ত্রীকে দেখানো হয়। তিনি বিশেষ করে পরামর্শ দেন সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের কিছু ছবি ও পাঠ বাদ দেওয়ার। পাশাপাশি ইতিহাসের বর্ণনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু এবার সামাজিক বিজ্ঞানের জন্য যে দুটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়েছে, তার একটি থেকে কিছু ছবি বাদ দেওয়া হলেও পাঠ সংশোধন করা হয়নি। আর অপর বইটিতে ছবি এবং পাঠ কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি।


সূত্র জানায়, এ বইটি একদম শেষ মুহূর্তে এনসিটিবিতে জমা দেওয়া হয়। সে কারণে কোনো ধরনের সম্পাদনা ছাড়াই মুদ্রণে পাঠানো হয়। ফলে অপ্রত্যাশিত বিষয় থেকে যাওয়ায় সমালোচকদের বির্তক সৃষ্টির পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষামন্ত্রী নিজে কিছু ছবি বাতিল করে দিলেও সেগুলো রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ‘অ্যাকটিভিটি’ (অনুশীলন) বই থেকে কিছু ছবি বাতিল করা হলেও ‘রেফারেন্স’ (সহায়ক) বইয়ে সেগুলো রাখা হয়েছে। যদি মন্ত্রীর পরামর্শ বাস্তবায়িত হতো তাহলে এখন বির্তক উঠতো না। যাদের কাজের জন্য ভুল-ভ্রান্তি ও বির্তক উঠেছে, তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নেমেছে। যারা এসব বই তৈরিতে কাজ করেছেন, তাদের আমলনামা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান আরও বলেন, পাঠ্যবইয়ের অসঙ্গতিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সেগুলো আমলে নিয়ে নতুন কারিকুলামের বইয়ে পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সেজন্য এ বছর দ্রুততার সঙ্গে বির্তক ওঠা বইগুলো পর্যবেক্ষণ কাজ শেষ করা হবে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক, শ্রেণি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে মতামত নেওয়া হবে। দেশের দুই হাজার থেকে তিন হাজার স্টেক হোল্ডারদের মতামত নেওয়া হবে। কোন কোন বিষয় কঠিন, অসঙ্গতি ও ভুল-ভ্রান্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো সংশোধন আনা হবে।

নবম শ্রেণির তিনটি বইয়ে ভুল থেকে যাওয়া প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, ২০১২ সালে লেখা বই ২০১৩ সালে শিক্ষার্থীদের হাতে গেছে। এরপর ২০১৭, ২০২০ এবং ২০২২ সালেও রিভিউ হয়েছে। বই একবার লেখানো হয়েছে, এরপর যৌক্তিক মুল্যায়ন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়ার পরও তিন বছর তিন দফায় পরিমার্জন করা হয়েছে। পরিমার্জন কমিটিতে লেখক কমিটির মতো ছয়জন করে সদস্য ছিলেন। সেখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, দুজন ক্লাস শিক্ষক, এনসিটিবির কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ থাকেন। এরপরও কেন পুরাতন বইয়ের মধ্যে ভুল তথ্য রয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এতদিন ধরে পড়ানো হচ্ছে, কেন কারো চোখে পড়লো না, এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি। তবে যেসব ভুল এখন চিহ্নিত করা হচ্ছে তার সব সঠিক নয়। কারণ, সপ্তম শ্রেণির গণহত্যা দিবস ২৫ বা ২৬ মার্চ, এ বিষয়ে পুরো অধ্যায় পড়লে মনে হবে না, শুধু ‘অবরুদ্ধ বাংলাদেশ’ অধ্যায় পড়লে সেখানে ভুল মনে হবে। এগুলো শুধু দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। সংসদের বিধান হচ্ছে ‘আইনসভা’ সংবিধানে সেটাই লেখা আছে। আমাদের দেশের আইনসভা হচ্ছে ‘জাতীয় সংসদ’।

দৈনিক দেশকাল/জেডইউ/ ২৪ জানুয়ারি, ২০২৩

 বাংলাদেশ থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ