মঙ্গলবার , ২৫ জুন e ২০২৪

বরিশাল সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনায় ১৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরমধ্যে তিনজন দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী মেয়র প্রার্থী ছিলেন। আর কমিটির সদস্যরা সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরন এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ ফারুকের অনুসারী বলে জানা গেছে।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বা সম্পাদককে রাখা হয়নি। তবে স্থান পেয়েছেন ধর্ষণ মামলার আসামি জসিম উদ্দিন। তিনি মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। রোববার (৩০ এপ্রিল) আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাদের সমন্বয়ে ১৬ সদস্যের ওই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির ১৫ নম্বর সদস্য করা হয়েছে জসিম উদ্দিনকে।

কমিটির সদস্যরা বলছেন, প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতের পছন্দে এই কমিটি গঠিত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি জসিম উদ্দিন বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল নগরীর এয়ারপোর্ট থানায় লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২১ এপ্রিল রাতে মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা গ্রহণ করে পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (বর্তমানে কাউনিয়া থানায় দায়িত্বরত) এসআই সাইদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মামলা দায়েরের তিন মাসের মধ্যে আসামি জসিম উদ্দিনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী তরুণী যেসব অভিযোগ এনেছেন তার অধিকাংশই তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে। যতদূর জানি এই মামলায় জামিনে রয়েছেন আসামি জসিম উদ্দিন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর বলেছেন, প্রার্থী তার নিজের পছন্দে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছেন। সেখানে কাকে রেখেছেন আর কাকে রাখেননি সে বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট লস্কর নূরুল হক বলেন, জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা এই মামলাটি ষড়যন্ত্রমূলক। একটি প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে মামলাটি দিয়েছেন। এ মামলায় জসিম উদ্দিনকে একদিনও কারাগারে যেতে হয়নি। তার মানে মামলাটি যে সাজানো তা আদালত বুঝতে পেরেছেন। তাছাড়া ডিএনএ টেস্টে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরেক সদস্য অ্যাডভোকেট আনিস উদ্দিন আহম্মেদ শহীদ বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় না দেবেন ততক্ষণ পর্যন্ত জসিম উদ্দিনকে এই অভিযোগে দায়ী করা যাবে না। তাছাড়া জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে আরেকটি পক্ষ বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র করে এসেছে। এই মামলাটিও ষড়যন্ত্রের অংশ।

ধর্ষণ মামলার আসামিকে কমিটির সদস্য করায় নৌকার প্রার্থীর ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে কিনা প্রশ্ন করা হলে আনিস উদ্দিন আহম্মেদ শহীদ বলেন, কমিটি একান্তভাবে প্রার্থীর নিজস্ব পছন্দে গঠন করা হয়েছে। এখানে তিনি তিনজন যুবলীগ নেতা, তিনজন ছাত্রলীগ নেতাকে স্থান দিয়েছেন।

কমিটির বিষয়ে প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতের মুঠোফোনে কল করা হলে তার বিশেষ সহকারী রুবেল রিসিভ করেন। তিনি জানান, যেকোনো প্রশ্ন করতে হলে প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে যেতে হবে। সেখানে তিনি সকাল-সন্ধ্যা থাকেন।

এদিকে ধর্ষণ মামলা দায়েরকারী তরুণী ঢাকা পোস্টকে বলেছেন, মামলার সঠিক বিচার হবে কিনা তা নিয়ে তিনি শঙ্কায় রয়েছে। তাছাড়া ধর্ষণ মামলার আসামি হয়েও রাজনৈতিক বড় বড় নেতাদের সঙ্গে চলাচল তাকে আতঙ্কের মধ্যে রাখছে। তিনি সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

ওই তরুণীর দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়, জসিম উদ্দিনের সঙ্গে আট বছর ধরে সর্ম্পক চলে আসছিল তার। সম্পর্কের বিভিন্ন সময়ে শারীরিক সম্পর্ক করার প্রস্তাব দেন জসিম উদ্দিন। ওই তরুণী প্রস্তাবে রাজি না হলে জসিম উদ্দিন বিয়ের প্রলোভন দেখান। এ সময় জসিম উদ্দিন বিভিন্ন ধরনের উপহার সামগ্রী দিয়ে আকৃষ্ট ও বিশ্বাস অর্জন করতে চান।

সেই সূত্র ধরে ২০১৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ওই তরুণীর বাসায় বেড়াতে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন জসিম উদ্দিন। এতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন তরুণী। জসিম উদ্দিন এই খবর শুনে গর্ভপাত করার প্রস্তাব দেন। রাজি না হলে সমাজে মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না বলে বোঝান। শেষে গর্ভপাত করার জন্য পিল এনে দেন জসিম। এতেও কাজ না হলে বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে ডা. তানিয়া আফরোজের মাধ্যমে গর্ভপাত করান।

পরবর্তীতে ঢাকা, বরিশালের বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় দেখা করার সময় বিয়ের প্রলোভন দিয়ে তরুণীকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন জসিম উদ্দিন। সর্বশেষ ২০২১ সালের ৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় ওই তরুণীর বাসায় গিয়ে সারারাত একসঙ্গে থাকেন জসিম উদ্দিন। এ সময় তরুণীকে তিন বার ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।

পরে জসিম উদ্দিন ওই তরুণীকে বিয়ে করতে অস্বীকার করলে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রায় দেড় বছর পলাতক থাকার পর ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও মালামাল জব্দের একটি আদেশ মাথায় নিয়ে আদালতে হাজিরা দিয়ে জামিন লাভ করেন। জামিন লাভের খবর শুনে আদালতে ছুটে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ধর্ষণ মামলার বাদী ওই তরুণী।

ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পরে জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। আহ্বায়ক করা হয় আরেক বিতর্কিত নেতা রইজ আহম্মেদ মান্নাকে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৬ সালে ছাত্রলীগ কর্মী রেজাউল করিম রেজা হত্যায় মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিম উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন নিহতের ভাই রিয়াজ উদ্দিন। মামলায়ও জসিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহও যোগ দিয়েছিলেন।

 মুক্তবাক থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ