মঙ্গলবার , ২৫ জুন e ২০২৪

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সে দিনগুলো

  রবিবার , ১৯ নভেম্বর ২০২৩

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়েছিলাম ১৯৬৭ সালে। কিন্তু এর সাথে আমার পরিচয় কিশোর বয়স থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তখন থেকেই আমি অনেকটাই একটি তীর্থভূমি বলে গন্য করে এসেছি।বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমার পদার্পনের সুযোগ হয়েছিল আরও পরে, আমার স্কুলজীবনের শেষ দিকে, বাষট্টি-তেষট্টি সালে। তখন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’র কাকডাকা ভোরে প্রভাতফেরি করে ক্যাম্পাস এলাকায় অবস্থিত শহীদ মিনারে আসতাম। সন্ধ্যায় সেখানে যে গণসংগীতের অনুষ্ঠান হতো, তাতে যোগ দিতাম। ১৯৬৫ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে আমি ছাত্র ইউনিয়নের নানা কাজে ও কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করেছিলাম। প্রায় প্রতিদিনই কলেজের ক্লাস শেষে বা ক্লাসের ফাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বটতলায়, মধুর ক্যান্টিনে, মিছিলে-মিটিংয়ে নিয়মিতই উপস্থিত হতাম। পাকিস্তানে তখন চলছিল ‘লৌহমানব’ ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের রাজত্ব। শ্রেণিগত শোষণের পাশাপাশি একনায়কতন্ত্র ও জাতিগত নিপীড়নের জাঁতাকলে দেশবাসী তখন প্রবলভাবে নিষ্পিষ্ট হচ্ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এনএসএফ নামে সরকারের পোষ্য সন্ত্রাসী গুন্ডা বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে সরকারি কলেজের ছাত্র বেতন ১ টাকা বৃদ্ধি করা্র বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল। ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপালের রক্তচক্ষুকে চ্যালেঞ্জ করে আমরা ধর্মঘট করার ‘দুঃসাহসী’ পদক্ষেপ সফল করেছিলাম। এ জন্য আমিসহ চারজনকে ঢাকা কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়ে আমরা সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েটের শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছিলাম। ১৯৬৬ সালে ৭ জুনের হরতালে পিকেটিং করার সময় গ্রেপ্তার হয়ে এক মাসের কারাদন্ড ভোগের মধ্য দিয়ে আমার নানা পর্বের কারাবাসের সূত্রপাত সেসময়টিতেই ঘটেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত আরো বেড়ে গিয়েছিল। ফলে, সেখানে আমার শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই তা ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে’ পরিণত হয়েছিল। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ১৯৬৭ সালে অর্থনীতি বিভাগে্র ছাত্র হিসেবে শুরু হয়েছিল আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। আবাসিক ছাত্র ছিলাম মহসিন হলের। ভালো ছাত্র হওয়ার সুবাদে শুরুতেই একটি সিঙ্গেল রুমও বরাদ্দ পেয়েছিলাম। রুম নম্বর ৬৬০। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের সবটাই কাটিয়েছিলাম সেই রুমে। অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে ছাত্র আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান কাজের পাশাপাশি একাগ্র ভাবে ক্লাস করা, লাইব্রেরি ওয়ার্ক, নোট তৈরি, টিউটোরিয়াল ইত্যাদি কাজে বিরতিহীন ব্যস্ত থাকতাম। ক্লাসের অন্যতম সেরা ছাত্র হওয়ায় আমাকে‘শ্রেণি প্রতিনিধি’ নির্বাচন করবে বলে সবাই স্থির করে রেখেছিল। এনএসএফের ‘বদী’ ও ‘সালেক’ আমার বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে আমাকে ভোটের আগেই ক্লাস থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই বদী-ই একাত্তরে দুর্ধর্ষ ‘ক্র্যাক প্লাটুনের’ সদস্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল এবং ঢাকায় সফল ‘অপারেশন’ পরিচালনা করেছিল। যুদ্ধে সে শহীদ হয়েছিল। ছাত্র সংগঠনগুলো তখন প্রায়ই শহরে দীর্ঘ পথ ধরে লম্বা মিছিল করত। টিভি ক্যামেরা বা ফটোগ্রাফারের মোহে মিছিল এখনকার মতো ‘লম্বার চেয়ে চওড়া বেশি’ হতো না। সাধারণত শহীদ মিনারে শুরু হয়ে প্রেসক্লাব, পল্টন মোড়, গুলিস্তান, নবাবপুর, ইসলামপুর, আরমানিটোলা, জেল গেট পার হয়ে আবার শহীদ মিনারে এসে তা শেষ হতো। অনেক সময় 'খন্ড মিছিল' ও পথসভাও হতো। সেসময় মাইকের ব্যবহার এখনকার মতো এতটা ছিল না। খালি গলাতেই, কিংবা টিনের চোঙা মুখের সামনে ধরে বক্তৃতা করতে হতো। ষাটের দশকজুড়ে শিক্ষার ন্যায্য দাবি, গণতান্ত্রিক অধিকার, রবীন্দ্রসংগীত-রবীন্দ্র সাহিত্যের ওপর আক্রমণ প্রতিহত করা, জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-আধিপত্য থেকে মুক্তি, প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণ, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন দাবিতে যেসব উত্তাল সংগ্রাম এবং শিক্ষা ও গনতন্ত্রের দাবীতে ’৬২ ও ৬৪-র আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা আন্দোলন, ১১ দফা দাবিতে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ইত্যাদির অন্যতম মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এসব ছোট-বড় অসংখ্য ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ অগ্রসর হচ্ছিল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ অভিমুখে। এসব সংগ্রামের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সুযোগ ও সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ক্রান্তিকালের কারিগর হতে পারা কেবল রোমাঞ্চকরই নয়। এর গৌরব অতুলনীয়। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল অনন্য ও অগ্রনী ভূমিকা। নানা বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে যে শক্তিশালী একটি 'র‍্যাডিকাল' রাজনীতির ধারা গড়ে উঠেছিল তার অন্যতম লালনভূমি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই ঐতিহ্যমন্ডিত উত্তরাধিকারকে ধারণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশগ্রহণ ঘটেছিল। যে মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে তার শ্রেষ্ঠ অর্জন। শুধু রাজনৈতিক কাজই নয়। সবসময় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করতাম। ১৯৬৯-এর এপ্রিলে ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলে টর্নেডো এবং ১৯৭০-এর অক্টোবরে দেশের উপকূলে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। সেসময় সহপাঠীদের নিয়ে আমি উভয় এলাকাতেই রাত-দিন পড়ে থেকে মাসাধিককাল করে একনাগাড়ে ত্রাণকাজ চালিয়েছিলাম। এর ফলে অনার্স পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটেছিল। কিন্তু পরে ‘ওভারটাইম’ পড়াশোনা করে তা পুষিয়ে নিয়েছিলাম। লেখাপড়ায় কখনো ফাঁক ঘটতে দিইনি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছিল। কমরেড মণি সিংহ আমাদেরকে তখন বলেছিলেন, ‘এটি আরও বড় সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সেল মাত্র'। কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ বলেছিলেন, ‘সশস্ত্র সংগ্রাম এখন এজেন্ডায় এসে গেছে'। সেই গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব শাহির পতনের পর ক্ষমতায় আসা ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল। সত্তরের সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেছিল। ১৯৭১-এর ১ মার্চ আমি মহসিন হলে বসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় খবর এসেছিল ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আমি বুঝে নিয়েছিলাম যে, স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। তখনই বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে পড়েছিলাম রাজপথে। ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সশস্ত্র সংগ্রামের প্রত্যক্ষ প্রস্তুতিকাজে। সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য 'গন বাহিনী' সংগঠিত করা শুরু করেছিলাম। প্রতিদিন সকালে তরুন-তরুনীদের অসংখ্য 'ব্রিগেডে' ভাগ করে অস্ত্রধারন ও প্যারেডের প্রশিক্ষন দেয়া শুরু করেছিলাম। বিকালে শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে মলোটভ ককটেল, হাই এক্সপ্লোসিভ, বুবি ট্র্যাপ ইত্যাদি কিভাবে বানাতে হয় মাইকে তার নির্দেশনা ও ‘ব্রিফিং’ প্রদান চালু করেছিলাম। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে রাইফেল কাঁধে নিয়ে 'গন বাহিনীর' ব্রিগেডগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেড় হয়ে ঢাকা শহরের প্রধান সড়কগুলোতে সুসজ্জিত প্যারেড করেছিল। অস্ত্র জোগাড় করে ‘লাইভ-ফায়ারিং'-এর প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়েছিল। বিস্ফোরক তৈরির কাজেও হাত দেয়া হয়েছিল। এসব কাজ সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও আমি দায়িত্বে ছিলাম। সায়েন্স এনেক্স, শহীদ মিনার, বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ ছিল ছাত্র ইউনিয়নের জন্য এসব কাজের কেন্দ্র।২৫ মার্চ কালরাত্রিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে কিছু ব্যারিকেড নির্মাণের চেষ্টাসহ কিছু ‘অতি কাঁচা’ ধরনের প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছিল। আমাদের এসব প্রতিরোধ-প্রয়াস সফল হয়নি। শুরু হয়েছিল বর্বর গণহত্যা। চালানো হয়েছিল নিষ্ঠূর ধ্বংসযজ্ঞ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হানাদার বাহিনীর অন্যতম প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছিল। ক্যাম্পাসকে পরিণত করা হয়েছিল বধ্যভূমিতে। সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে আমরা আমাদের শক্তিকে ‘রিগ্রুপ’ করে ভারতে চলে গিয়েছিলাম। কর্মীদের একটি অংশকে দায়িত্ব দিয়ে দেশের ভেতরে রেখে গিয়েছিলাম। আমি নিজে বিশেষ গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিংপ্রাপ্ত হয়ে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের অপারেশন কমান্ডারের দায়িত্ব নিয়ে অস্ত্র হাতে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা দখলের অভিযানের অংশ হিসেবে একটি বড় গেরিলা দলকে কমান্ড করে, অনেকটা ‘ফোসর্ড মার্চ’-এর কায়দায় ঢাকার উপকণ্ঠে এসে আমরা ঘাঁটি স্থাপন করেছিলাম। ১৬ ডিসেম্বর ভো্রে গোটা ‘গেরিলা দল’ নিয়ে ঢাকার দিকে যাত্রার চূড়ান্ত ‘অপারেশন’ শুরু করেছিলাম। পরদিন সকালে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে আমরা শপথ নিয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স এনেক্স ভবনে আমরা আমাদের গেরিলা বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রাঙ্গণ থেকে ‘মুক্তি না হয় মৃত্যু’ এই শপথ নিয়ে নয় মাস আগে যাত্রা শুরু করেছিলাম, অস্ত্র হাতে বিজয়ীর বেশে সেখানে ফিরে এসেছিলাম। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক করেছিলাম। আমি হাতে অস্ত্র নিয়েই সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। বৈঠকে ‘লাখো শহীদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ, এসো এবার দেশ গড়ি’ - এই স্লোগানের ভিত্তিতে সার্বিক বহুমুখী কর্মকান্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রথমেই দেশের জন্য একটি প্রগতিশীল শিক্ষানীতি প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছিলাম। শিক্ষানীতির খসড়া প্রস্তাবনা প্রণয়নের জন্য নিজেরাই একটি 'শিক্ষা কমিশন' গঠন করেছিলাম। ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় ছাত্র ইউনিয়নের এই নিজস্ব 'শিক্ষা কমিশনের' প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিজয়ের দুই মাসের মধ্যে প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির খসড়া দেশবাসীর সামনে আমরা তুলে ধরেছিলাম। ‘সমাজতন্ত্রের পথে দেশ গড়ার’ প্রত্যয় ও প্রচেষ্টাকে শুরু থেকেই নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পাকিস্তানপন্থি পরাজিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তি অন্তর্ঘাতসহ ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে শুরু করেছিল। শাসক দল আওয়ামী লীগের মধ্যেও ছিল নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও ভেজালের উপস্থিতি। অনেকে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। গড়ে উঠেছিল ‘নব্য ধনীকের’ একটি লুম্পেন গোষ্ঠী। একটি অংশ ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ স্লোগান তুলে বিভ্রান্তি ছড়াতে সক্ষম হয়েছিল এবং ‘অতি বিপ্লবী’ পদক্ষেপ গ্রহণ করে স্বাধীনতা সংহত করার কাজটিকে কঠিন করে তুলেছিল। ১৯৭২ সালের ৯ থেকে ১১ এপ্রিল ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে (তখন সেটিকে ‘রেসকোর্স ময়দান’ বলা হতো) ছাত্র ইউনিয়নের ৩ দিনব্যাপী ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। তার মাসখানেক পরে ২০ এপ্রিল স্বাধীন দেশে প্রথম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ নির্বাচনে আমি ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছিলাম। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই সেবার জয়ী হয়েছিল ছাত্র ইউনিয়ন। ডাকসুর দায়িত্ব পাওয়ার পর আমরা প্রগতির ধারায় ‘দেশ গড়ার’ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযান, ব্রিগেড আন্দোলন, ভুয়া রেশন কার্ড উদ্ধার অভিযান ইত্যাদি নানা ধরনের কাজ শুরু করেছিলাম। গ্রীষ্মের ছুটিতে ১০-১২ জনের ‘ছাত্র ব্রিগেড’ গঠন করে সেগুলো ৪-৫ সপ্তাহের জন্য শহর ছেড়ে বিভিন্ন গ্রামে পাঠান হয়েছিল। কায়েমি স্বার্থবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েও ব্রিগেড সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছিল। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের স্বেচ্ছাশ্রমে এফ রহমান হলের অস্থায়ী টিনশেড নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। দেশে বন্যা ও দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে প্রতিদিন ভোরে হাজার-হাজার রুটি বানিয়ে বিমানবাহিনীর সহায়তায় হেলিকপ্টারে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়েছিল। ফসলের আবাদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রেসকোর্স ময়দান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহসীন হলের মাঠে বীজতলা তৈরি করে সেই চারা সরাসরি কৃষকের কাছে বিতরণ করা হয়েছিল। ডাকসুর নিজস্ব পত্রিকা ‘ডাকসু বার্তা’ নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গড়ে তোলা হয়েছিল নব-ধারার নাটকের দল ‘নাট্যচক্র’। বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, নাটক মঞ্চায়ন ইত্যাদি চলছিল হলে হলে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে। কলাভবন চত্বরে আমেরিকার প্রগতিশীল সংগীতশিল্পী ডিন রিড, পশ্চিমবঙ্গের পূর্ণদাস বাউল প্রমুখসহ বড়-বড় দেশীয় শিল্পীর কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল। ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক পরিবেশ জমজমাট হয়ে উঠেছিল। ডাকসুর উদ্যোগে ‘অপরাজেয় বাংলা’র নির্মাণকাজের সূচনা করা হয়েছিল। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৬-৭ বছরে এটির নির্মাণ সমাপ্ত করা গিয়েছিল। স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম ডাকসুর অনবদ্য কীর্তি হিসেবে এটি আজ দেশবাসী, বিশেষত ছাত্র সমাজের দ্রোহ-সংগ্রামের প্রতীক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ উন্নত করার জন্য আমাদের প্রয়াসের অন্ত ছিল না। জনপ্রিয়তা (!) কমতে পারে জেনেও ‘অটোপ্রমোশন’ বা ‘পরীক্ষা পেছানোর’ অযৌক্তিক দাবিকে আমরা প্রতিবারই প্রকাশ্যে বিরোধিতা ও প্রতিরোধ করেছিলাম। পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। দীর্ঘ পরাধীনতার কারণে পিছিয়ে পড়া জাতির ‘হারানো সময়’ পুনরুদ্ধারের জন্য ছাত্র সমাজকে বাড়তি খাটুনি দিয়ে এক্সট্রা সময় পড়াশোনা করে ৩ বছরের কোর্স পারলে ২ বছরে শেষ করার জন্য বলতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রেওয়াজ চালু করা হয়েছিল যে, প্রত্যেক বিভাগে সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রদের ‘ব্লোউন-আপ’ ছবি নোটিশ বোর্ডে লাগিয়ে রাখা হতো। তা ছাড়া একাডেমিক বছর শুরুর প্রথম দিনটিতে প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান-সালাম জানানো শেষে শিক্ষক-ছাত্রদের মিলিত শোভাযাত্রা শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদদের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করে নতুন শিক্ষা বছর শুরু করত। এসব রেওয়াজ ১৯৭৫-এর পর আর চালু থাকেনি। ডাকসুর নেতারাসহ ৬ জন ছাত্রনেতাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট সেদেশে ভ্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কলাভবনের বটতলার বিশাল ছাত্র সমাবেশে দাঁড়িয়ে আমি প্রবল ঘৃণা্র সাথে পকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদদাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই আমন্ত্রণপত্রটি ক ছাত্রছাত্রীদের উল্লসিত সম্মতিতে ছিঁড়ে ফেলেছিলাম।এসব কাজে সবাইকে সঙ্গে পাওয়া যায়নি। অনেকেই দুরাচার ও দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহসীন হলে সংগঠিত হয়েছিল ‘সেভেন মার্ডার’। ১৯৭৪ সালে ঘটেছিল ডাকসু নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের কলঙ্কিত ঘটনা। ছিনতাইয়ের এই ঘটনার সঙ্গে আমি বা ডাকসু ও ছাত্র ইউনিয়ন কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। কিন্তু পরের দিন সাংবাদিকদের কাছে এ ঘটনার জন্য জাসদ-ছাত্রলীগকে অভিযুক্ত করে আমি একটি চরম ‘মিথ্যা’ কথা বলেছিলাম। আমার জীবনে এ ধরনের, সম্ভবত একমাত্র একটি মিথ্যাচার করার জন্য আমি অবশ্য অনেক আগেই প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছি।নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ১৯৭৩ সালেই আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ডাকসু নির্বাচন ভন্ডূল হওয়ায়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নেওয়া সত্ত্বেও, কাগজে-কলমে আমি ডাকসু ভিপি রয়ে গিয়েছিলাম। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। আমার নেতৃত্বে এই বর্বর হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছিল। প্রবল বিপদ ও ঝুঁকি উপেক্ষা করে সেদিন ঘরে-ঘরে ঘুরে-ঘুরে সেজন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এ ক্ষেত্রে তেমন একটা পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় যেদিন প্রথম খুলেছিল সেদিনই আমরা ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই’ স্লোগান তুলে ক্যাম্পাসে ঝটিকা মিছিল করেছিলাম। ৪ নভেম্বর বটতলা্য আমার সভাপতিত্বে সমাবেশ শেষে ‘মৌন মিছিল’ করে ৩২ নম্বরের বাসায় গিয়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেছিলাম। এদিকে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয়েছিল জেল হত্যাকান্ড। পরদিন সেকথা জানা গিয়েছিল। এর প্রতিবাদে ৫ নভেম্বর অর্ধদিবস হরতাল ও গায়েবানা জানাজা সংগঠিত করেছিলাম। তার পরই ৭ নভেম্বর ঘটনাবলি দেশকে নৈরাজ্যের আরেক পর্বে নিয়ে গিয়েছিল। আমি ও আমাদের ওপর নেমে এসেছিল চরম নির্যাতন। কিছুদিন পরই আমি গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। তার পর টানা দু'বছর বিনা বিচারে নিরাপত্তা বন্দি হিসেবে ঢাকা জেলে বন্দিজীবন কাটিয়েছিলাম। এর মধ্যেই ডাকসুর বিলুপ্তি ঘোষিত হয়েছিল। ১৯৭৮-এর শেষে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আগের মতো আর ক্যাম্পাসে ফিরে যাইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বছরে এক-আধবার সেখানে হয়তো যাওয়া হয়। কিন্তু ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যেভাবে যাওয়া হতো এখনকার যাওয়া তেমনটি মোটেই নয়। পুরনো সেই দিনগুলোর কিছু ঘটনার কথা লিখতে গিয়ে প্রবলভাবে অনুভব করলাম যে, আরও অনেক ঘটনা, অনেক কথা বলা বাকি থেকে গেল। সেগুলো লিখতে গেলে একটি বই হয়ে যাবে।

 মুখোমুখি থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ