প্রকাশিত : বৃহঃস্পতিবার , ৩০ জুলাই ২০২৬ , সকাল ১০:৪৬।। প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার , ৩১ জুলাই ২০২৬ , রাত ০৩:৫৩
রিপোর্টার : বিশেষ প্রতিবেদন:

ইস্টার্ন কেবলসে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অন্তরালে আর্থিক বিশৃঙ্খলা, নিয়ম লঙ্ঘন ও 'উইন্ডো ড্রেসিং'-এর ভয়াবহ চিত্র


রিপোর্টার : Deshkal

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন কেবলস লিমিটেডের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে। বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের (BSEC) অধীনস্থ এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানের ৩০ জুন ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান MABS & J Partners "Qualified Opinion" বা শর্তসাপেক্ষ মতামত দিয়েছে।

নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক হিসাবমান (IAS/IFRS) অনুসরণে একাধিক ঘাটতি, সম্পদের যথাযথ যাচাইয়ের অভাব, দীর্ঘদিনের অনাদায়ী পাওনা, কর্মচারী কল্যাণ তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং বকেয়া লভ্যাংশ সংরক্ষণে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে।
৮৯০ কোটি টাকার সম্পদ, কিন্তু ভৌত যাচাই হয়নি

কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে প্রায় ৮,৯০৯,৭৮৪,১৭৬ টাকা স্থায়ী সম্পদ দেখানো হয়েছে। নিরীক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সম্পদের বড় অংশই পূর্ববর্তী পুনর্মূল্যায়নের (Asset Revaluation Reserve) মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্য। তবে প্ল্যান্ট, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদের ভৌত যাচাই এবং সম্পদ ট্যাগিং যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি।

একই সঙ্গে IAS 36 অনুযায়ী প্রয়োজনীয় Impairment Test সম্পন্ন না হওয়ায় সম্পদের প্রকৃত পুনরুদ্ধারযোগ্য মূল্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে কোম্পানির প্রদর্শিত নিট সম্পদ মূল্য (NAVPS) বাস্তব অবস্থার তুলনায় বেশি দেখানো হয়ে থাকতে পারে বলে অডিটে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
১৫ কোটি টাকার দেনা, কিন্তু ১৬টি নিশ্চিতকরণ চিঠিই ফেরত

আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, কোম্পানির মোট বাণিজ্যিক পাওনা প্রায় ১৫০.৬ মিলিয়ন টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন টাকা দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে।

নিরীক্ষকরা পাওনা নিশ্চিত করতে দেনাদারদের কাছে ১৬টি Confirmation Letter পাঠালেও সবগুলোই অপ্রাপ্য হিসেবে ফেরত আসে।

এ পরিস্থিতিতে অডিটে পাওনার প্রকৃত অস্তিত্ব ও আদায়যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে IFRS 9 অনুযায়ী প্রয়োজনীয় Expected Credit Loss (ECL) সংরক্ষণ না করায় আর্থিক বিবরণীতে মুনাফা ও সম্পদের মূল্য বাস্তবের তুলনায় বেশি দেখানো হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অসঙ্গতি

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রভিডেন্ট ফান্ড ঋণ থেকে আদায়কৃত প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট ফান্ডে জমা হয়নি।

এ ছাড়া গ্র্যাচুইটির দায়ও প্রায় ৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা কম দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ।

অডিট প্রতিবেদনে এসব বিষয়কে বাংলাদেশ শ্রম আইন, শ্রম বিধিমালা এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান IAS 19-এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অর্থ আত্মসাৎ বা ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি; বিষয়গুলো তদন্তসাপেক্ষ।

বকেয়া লভ্যাংশে প্রায় ৩ কোটি টাকার অসঙ্গতি:
সবচেয়ে আলোচিত পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো বকেয়া লভ্যাংশের হিসাব। কোম্পানির লেজার অনুযায়ী অবণ্টিত ও বকেয়া লভ্যাংশের পরিমাণ প্রায় ২৯.৬৩ মিলিয়ন টাকা। কিন্তু নির্দিষ্ট ডিভিডেন্ড ব্যাংক হিসাবে পাওয়া গেছে মাত্র ৭৮,৭৪৯.৭৭ টাকা।

এই বড় ধরনের ব্যবধানের বিষয়ে নিরীক্ষকরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি। ফলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (BSEC) নির্দেশনা অনুযায়ী অবণ্টিত লভ্যাংশ সংরক্ষণের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উৎপাদন প্রায় বন্ধের পথে

আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা ৪,৫০০ মেট্রিক টন হলেও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৩৪৭.৪৩ মেট্রিক টন, অর্থাৎ সক্ষমতার প্রায় ৭.৭ শতাংশ।

অন্যদিকে কোম্পানির রাজস্ব কমে ৭৫০.৭৭ মিলিয়ন টাকা থেকে ৩০০.৬০ মিলিয়ন টাকায় নেমে এসেছে, যা প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।

একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (EPS) আগের বছরের ০.৫৯ টাকা মুনাফা থেকে (৪.৪৩) টাকা লোকসানে পরিণত হয়েছে।

নিরীক্ষকদের প্রধান পর্যবেক্ষণ: স্থায়ী সম্পদের ভৌত যাচাই ও ট্যাগিং সম্পন্ন হয়নি।
    IAS 36 অনুযায়ী সম্পদের Impairment Test করা হয়নি।
    IFRS 9 অনুযায়ী Expected Credit Loss (ECL) সংরক্ষণ করা হয়নি।
    দীর্ঘদিনের অনাদায়ী পাওনার যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
    প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি হিসাব আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী উপস্থাপন করা হয়নি।
    বকেয়া লভ্যাংশ সংরক্ষণে বড় ধরনের হিসাবগত অসঙ্গতি রয়েছে।
    অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় আর্থিক তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

হিসাববিজ্ঞান ও করপোরেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোনো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অডিট পর্যবেক্ষণ কেবল হিসাবগত দুর্বলতার বিষয় নয়; এটি অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, পরিচালন দক্ষতা এবং সুশাসনের ঘাটতিরও ইঙ্গিত বহন করে।

তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি ও অনিয়মের ইঙ্গিত দিলেও অর্থ আত্মসাৎ, তছরুপ, মানি লন্ডারিং বা ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পৃথক তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া আবশ্যক।