রিপোর্টার : Deshkal জ্বিন সাধনার মাধ্যমে যাবতীয় জটিল সমস্যার সমাধান ও তদবিরের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে ‘তান্ত্রিক কবিরাজ মঈনুল ইসলাম’ নামের এক ব্যক্তি। দীর্ঘ দিন ধরে এই ভণ্ডামির আড়ালে মানুষের সরলতা ও অন্ধবিশ্বাসকে পুঁজি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা একক ব্যক্তির কাজ নয়; বরং একটি সুসংগঠিত প্রতারক সিন্ডিকেট। নিত্যনতুন চতুর কৌশল ও প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং অর্থ আত্মসাত করাই এই চক্রের মূল লক্ষ্য। কখনো ফেসবুকে চোখধাঁধানো স্পনসরড বিজ্ঞাপন, আবার কখনো মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলের (যেমন-আরটিভি, যমুনা টিভি) সংবাদ ও লোগো ব্যবহার করে এরা নিজেদের বিশ্বস্ততা তৈরি করছে। এমনকি ভিডিও কল, এআই (AI) প্রযুক্তি ও সাইবার কৌশলে কৃত্রিম জ্বিনের কণ্ঠ তৈরি করে তা ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখিয়ে শত শত পরিবারকে নিঃস্ব করে ফেলা হচ্ছে। এই চক্রের এক সদস্যের বিরুদ্ধে সম্প্রতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায় মাসুম মজুমদার নামে এক ভুক্তভোগী বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন।
প্রতারণার সুনিপুণ কৌশল:
মঈনুল ইসলাম নামে বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ খুলে নিয়মিত এসব চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। পেজগুলোতে কখনো নিজেদের ঠিকানা আশুলিয়া আবার কখনো ঘাটাইল বলে উল্লেখ করা হয়। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো ঠিকানায় গেলে তাদের নাগাল পাওয়া যায় না। বিজ্ঞাপনে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে বড় বড় টিভি চ্যানেলের সংবাদ পাঠকদের ভিডিও ক্লিপ কেটে এআই-এর সহায়তায় ভয়েস ওভার বা বিবরণ যুক্ত করা হয়। এরপর তান্ত্রিক মঈনুলের মনগড়া বক্তব্য প্রচার করে সাথে দেওয়া হয় বিভিন্ন মোবাইল নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপ/ইমু আইডি।
প্রাথমিকভাবে সমস্যা সমাধানের কথা বলে রোগের ধরন অনুযায়ী ‘হাদিয়া’ বা ফি নেওয়া হয়। টাকা পাঠানোর জন্য দেওয়া হয় বিকাশ নম্বর। টাকা পাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী বা ভুক্তভোগীর ছবি চাওয়া হয় এবং ‘জ্বিনের আসন বসানোর’ কথা বলে বিভিন্ন উপকরণের বায়না ধরা হয়।
পরের দিন সকাল থেকেই শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক চাপ। মুসলিম ভুক্তভোগীদের প্রথমে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর এআই দিয়ে কৃত্রিমভাবে তৈরি জ্বিনের ভোগের বিভিন্ন উপকরণের ওপর বসা একটি ছবি ইমু বা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দুর্বল মনের মানুষগুলো এই ভয়ংকর ছবি ও কাল্পনিক কথাবার্তায় মানসিকভাবে সম্পূর্ণ প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
ধাপে ধাপে সর্বস্বান্ত করার ফাঁদ:
দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে বলা হয়, সমস্যা অনেক জটিল এবং সাধারণ তদবিরে কাজ হবে না। শক্তিশালী জ্বিনের মাধ্যমে সমাধান করতে হলে বড় ‘ভোগ’ বা উপাদানের প্রয়োজন। তখন চাহিদার তালিকায় জুড়ে দেওয়া হয় অদ্ভুত ও দীর্ঘ এক ফর্দ: সোকেজি আতপ চাল ও সোয়া কেজি ভাতের চাল, সাত সমুদ্রের ঘোলা ও বাঁধা পানি এবং জোয়ার-ভাটার পানি, ১৮টি করে সুই, বড়শি, মানসের কাটা ও বিচিওয়ালা কলা, ৩টি নিজ কালার কবুতর, ১টি মহিষের মাথা, ১টি জায়নামাজ, ১০টি করে আগরবাতি ও মোমবাতি, আড়াই শ গ্রাম বুজ পাতা, হরিণের নাভির নিচের কস্তুরি, মক্কার মরিয়ম ফুল, ৩ দফা কাফনের কাপড়, মরা মানুষের হাড্ডি, লাল পাহাড়ের মাটি, এক সিন্দুক সিঁদুর, ধূপ, চন্দন, মিষ্টি, জাফরান কালি ও জমজমের পানি।
এসব আজব ও ভীতিকর উপাদানের কথা শুনে সেবাগ্রহীতার মনে ভয় ও আবেগ তৈরি করা হয়। কাজ না করালে জ্বিন আরও রাগান্বিত হয়ে বড় ক্ষতি করবে—এমন ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় বড় অংকের টাকা। কেউ টাকা দিতে দেরি করলে তাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়।
এদিকে ফেসবুকে বিজ্ঞাপনের কমেন্ট বক্স ভরে রাখা হয় অসংখ্য ফেক আইডির মাধ্যমে। সেখানে সাজানো নাটকের মাধ্যমে তদবির নিয়ে সুস্থ হওয়ার ভুয়া ইতিবাচক কমেন্ট দেখে নতুন সাধারণ মানুষ সহজে তাদের ফাঁদে পা দেয়।
বিকাশ নম্বরেও লুকোচুরি:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে প্রতারক মঈনুল যে বিকাশ নম্বরটি (০১৭৭৪১২৭১৪৮) ব্যবহার করে আসছে, সেটিও তার নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধিত নয়। অনুসন্ধান বলছে, নম্বরটি মুন্সিগঞ্জের ৫৭ বছর বয়সী রোকেয়া বেগম এবং নেত্রকোনার মতিউর রহমানের এনআইডি ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। এই চক্রটি দাবি করে, তাদের ক্ষমতার পরিধি এতটাই ব্যাপক যে সমুদ্রে জাহাজ ডুবে গেলেও জ্বিনের মাধ্যমে তা তুলে আনা সম্ভব!
এই চক্রটি একেক সময় ভিন্ন ভিন্ন নম্বর ও ঠিকানা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে। এ ধরনের প্রতারকদের খপ্পর থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এবং এদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সর্বস্বান্ত হওয়া ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।
আপনার দেওয়া তথ্য ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এটি আরও প্রমিত সাংবাদিকতার রূপ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এতে আপনি যেকোনো উপাত্ত বা পরিবর্তন যোগ করতে পারেন।