প্রকাশিত : বৃহঃস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , দুপুর ০২:১৭।। প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহঃস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , বিকাল ০৪:১৭
রিপোর্টার : অনলfইন ডেস্ক:

ইউরোপে ব্যাপক কমেছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি


রিপোর্টার : Deshkal

 চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা।

এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম।

ইইউতে অন্য কোনো দেশের রপ্তানি এতটা কমেনি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ কমেছে তুরস্কের। ভারত ও পাকিস্তানের কমেছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ২৪ ও ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ। কম্বোডিয়ার কমেছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভিয়েতনামের, ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। চীনের বেড়েছে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমে যাওয়ার চিত্রটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিসের (ইউরোস্ট্যাট) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

বুধবার প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৫ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে ইইউয়ের বিভিন্ন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ১০ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক; মোট রপ্তানির আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে।

একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পোশাক রপ্তানি থেকে মোট যে আয় আসে, তার ২০ শতাংশের মতো আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। অন্যদিকে জোটগত ভাবে ইউরোপের বাজারগুলো থেকে আসে ৬০ শতাংশের মতো।

ইইউয়ের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সব সময়ই চীনের আধিপত্য। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে দেশটি ১ হাজার ৬৪২ কোটি ১৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে এই সাত মাসে ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে ২৫৫ কোটি ১৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে।

এই তথ্য বলছে, সামগ্রিকভাবে ইইউর ব্যবসায়ীরা তৈরি পোশাক কেনা কমালেও চীন ও ভিয়েতনাম থেকে বাড়িয়েছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো। ইইউর ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দেশ থেকে গড়ে যে তৈরি পোশাক কেনা কমিয়েছেন, তার তুলনায় বাংলাদেশ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ কম কিনেছেন।

এই বাজারে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে।

গত বছরের একই সময়ে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছিল ১ হাজার ২০১ কোটি ২১ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক।

এ হিসাবই বলছে, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

এদিকে ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ (৪.৬৬ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কম। তবে এই ধাক্কার পরও বাজারটিতে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৪৯৮ কোটি ২৬ লাখ (৪.৯৮ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিলেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) গত ৫ সেপ্টেম্বর এ তথ্য প্রকাশ করে।

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমার কারণ জানতে চাইলে বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, “সামগ্রিকভাবেই রপ্তানি অবস্থা ভালো নয়। গত অর্থবছরে আমাদের পোশাক রপ্তানি ২ শতাংশের মতো কমেছে। বিশ্ব পরিস্থিতি অনুকূলে নয়; অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ভালো নয়। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নানা সমস্যা। এ অবস্থায় আগামী দিনগুলো কেমন যাবে, বুঝতে পারছি না।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিসকে তিনি বলেন, “তিন কারণে ইইউয়ের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমছে। এক— বাজারটিতে ভোক্তা পর্যায়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমেছে। দুই— ইইউতে ‘আগ্রাসী বিপণন’ করে চীন ক্রয়াদেশ নিচ্ছে। তিন— ভারতের সঙ্গে এফটিএ হওয়ায় ইইউয়ের অনেক ক্রেতা দেশটিতে ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিচ্ছে।”

চীন ও বাংলাদেশের পর ইইউতে শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক হলো তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া।

এর মধ্যে তুরস্ক গত জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ৪৩৮ কোটি ৪৩ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।

ভারত ২৭৪ কোটি ৩৪ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে; তাদের কমেছে ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ।

শীর্ষ ১০ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের মধ্যে চীন ও ভিয়েতনামের ছাড়া বাকি সব দেশেরই কমেছে।

এছাড়া জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইউরোপের বাজারে কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। পাকিস্তানের ১১ দশমিক ৮১, মরক্কোর ৬ দশমিক ৭২, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ৮৩ এবং ইন্দোনেশিয়ার তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ১২ শতাংশ।

ইইউয়ের বাজারে চীন বাংলাদেশের চেয়ে বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করলেও পরিমাণের দিক থেকে দেশটি পিছিয়ে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) চীন ইইউয়ের বাজারে ৮১ কোটি ৬২ লাখ ৬০ হাজার কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে এই সাত মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৭৫ কোটি ১৯ লাখ ১০ হাজার কেজি তৈরি পোশাক, যা গত বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কম।

ইইউতে চীনের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে মূলত তৈরি পোশাকের দামে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে চীন ইউরোপের বাজারে প্রতি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ২০ দশমিক ২০ ইউরোতে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ১৮ শতাংশ কম।

আর বাংলাদেশ প্রতি কেজি রপ্তানি করেছে ১৩ দশমিক ৮০ ইউরোতে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম।

যদিও তুরস্ক, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি করা প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের দাম বেড়েছে। ভারতের কমেছে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপের বাজারেও পোশাক রপ্তানি কেন কমছে— এ প্রশ্নের জবাবে পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সামগ্রিক হিসাবে ইইউর ব্যবসায়ীরা কিন্তু কম পোশাক আমদানি করেছে। তার প্রভাব আমাদের উপরও পড়েছে।

“আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভিয়েতনামের কিন্তু বেড়েছে; এটাই উদ্বেগের। আরও চিন্তার বিষয় যে, আমাদের সবচেয়ে বেশি কমেছে।”

তিনি বলেন, “কিছুটা আশার কথা যে, সবশেষ জুন ও জুলাই মাসে আগের পাঁচ মাসের তুলনায় এই বাজারে আমাদের রপ্তানি কম কমেছে। জানুয়ারি থেকে মে মাস বেশি কমেছিল। বছরের বাকি পাঁচ মাস কী হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।”