প্রকাশিত : শনিবার , ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , সন্ধ্যা ০৬:৫৯।। প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার , ১ নভেম্বর ২০২৬ , বিকাল ০৪:৩২
রিপোর্টার : বিশেষ প্রতিবেদক:

সরকারি ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগে জনতা-অগ্রণীতে অসন্তোষ


রিপোর্টার : Deshkal

জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বেসরকারি ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাংক দুটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যাংকে কাজ করে আসা কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, এ ধরনের নিয়োগ তাদের পদোন্নতির স্বাভাবিক পথকে সংকুচিত করবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করে ব্যাংক দুটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, বেসরকারি খাত থেকে আসা নতুন এমডিদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার ঘাটতি তৈরি হলে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

সম্প্রতি জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকটি শাখা পরিদর্শন করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়। তবে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা বেসরকারি ব্যাংকারদের সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগের বিষয়ে তাদের মতামত দেন।

জনতা ব্যাংকের এক কর্মকর্তা এ নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এতে সরকারি ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যাংকে কর্মরত উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সাধারণত এমডি হওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়ার ফলে তাদের সেই ক্যারিয়ার প্রত্যাশা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, “আমি জানি না, বেসরকারি ব্যাংকাররা কেন বর্তমান বেতনের অর্ধেকেরও বেশি ছাড় দিয়ে সরকারি ব্যাংকের এমডি হতে রাজি হয়েছেন। বিষয়টি খুবই বিস্ময়কর।”

ওই কর্মকর্তা বলেন, বছরের পর বছর ব্যাংকে কাজ করার পর একজন কর্মকর্তা স্বাভাবিকভাবেই অবসরের আগে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যাওয়ার প্রত্যাশা করেন।

“আমরা বছরের পর বছর ব্যাংকে কাজ করেছি। স্বাভাবিকভাবেই অবসরের আগে এমডি হওয়ার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু এখন সেই সুযোগটি অন্যদের দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে,” বলেন তিনি।

তার আশঙ্কা, ব্যাংকের অভ্যন্তরে বিদ্যমান অসন্তোষের কারণে সম্প্রতি মনোনীত এমডিদের জন্য কাজ করা সহজ নাও হতে পারে। কারণ সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের কাজের ধরন, ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

সরকারি ব্যাংকে দুই দশকের বেশি সময় কাজ করা আরেক কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের নিয়োগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। বাইরে থেকে আসা একজন এমডিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সহজে গ্রহণ না করলে তা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, একজন বহিরাগতকে ব্যাংকের কার্যক্রম, আর্থিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো বুঝতে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করতে হবে। এতে শুরুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনায় কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

তার মতে, খেলাপি ঋণের (এনপিএল) চাপে থাকা সরকারি ব্যাংকগুলোতে নতুন করে এমন ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ মো. মাজেদুল হক বলেন, সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগের সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়নি। তার মতে, সরকারি ব্যাংক পরিচালনা বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

তিনি বলেন, “সরকারি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা পূরণ করে জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) হন। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকে বোর্ড বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কাউকে পদোন্নতি দিতে পারে।”

“আমার মতে, বেসরকারি ব্যাংকের একজন ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে (ডিএমডি) সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) করা ঠিক হয়নি। তারা ব্যাংক ভালোভাবে চালাতে পারবেন না,” বলেন তিনি।

এদিকে, গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাবের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সময় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বিতরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

“রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ব্যাংকিং বা আর্থিক খাত ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনুচিত,” বলেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সমান কর্তৃত্ব থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।