রিপোর্টার : Deshkal
একটি অপ্রত্যাশিত চরিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে: "ডোনাল্ড ট্রাম্প" নামের একটি অ্যালবিনো (ধলা) মহিষ, যা বাংলাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশ যখন পবিত্র ঈদুল আজহার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন একটি নিরীহ প্রাণীর নাম বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামে রাখা এবং সেটিকে কুরবানির জন্য প্রস্তুত করার এই ঘটনাটি একটি পরাবাস্তব অথচ গভীর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়: এই আয়োজন কি কোনো গোপন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনীতি নিয়ে এক গভীর ক্ষোভ? আরও বড় প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকেরা কি এই স্থানীয় ঘটনার পেছনের প্রতীকী বার্তা কখনো বুঝতে পারবেন?
এই পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে সমসাময়িক বাংলাদেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ড. ইউনুস সরকারের একতরফা বাণিজ্য চুক্তিকে।অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য ও জ্বালানি চুক্তিকে ‘হরমুজ প্রণালির চেয়েও বড় বাধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, যিনি ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের শ্বেত পেপার প্রণয়ন কমিটির প্রধান ছিলেন l
দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই অবিস্মরণীয় গণ-অভ্যুত্থান পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না; বরং এটি ছিল ওয়াশিংটন বা আমেরিকার ‘ডিপ স্টেট’-এর (গোপন নীতি-নির্ধারক গোষ্ঠী) এজেন্ডা দ্বারা চালিত একটি সুপরিকল্পিত নীল নকশা।
এই নাটকীয় পটপরিবর্তনের পর, দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতীক ও আদর্শিক ভিত্তিগুলো এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে "জাতির পিতা" হিসেবে সম্মান জানানোর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যটি এখন রাজনৈতিক প্রতিশোধের আগুনে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও আইনি ভাবে উপড়ে ফেলা হয়েছে। এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে এক শক্তিশালী ধর্মীয় ধারা, যা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে—রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ইতিহাসে এমন রূপান্তর বিশ্বজুড়ে এক বিরল ঘটনা।
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মতে, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) হলেন সেই মহান নবী যিনি মানবজাতিকে হজের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং ঈদুল আজহায় পবিত্র কুরবানির ঐতিহ্যের সূচনা করেছিলেন। এক অদ্ভুত কাকতালীয় বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামধারী একটি প্রাণীকে এবার বছরের সেরা কুরবানির পশু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই অদ্ভুত প্রকাশ্য প্রদর্শনী কি কেবলই এক ধরনের রসাত্মক প্রিয়তা, নাকি এটি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবাধ্যতার একটি পরিকল্পিত ও অত্যন্ত প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ?
এই দেশের মানুষের স্থানীয় ক্ষোভকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত আমেরিকার একতরফা চুক্তি এবং তাদের কঠোর কূটনৈতিক চাপের কারণে জনগণের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভেরই সরাসরি প্রতিফলন। এই সংঘাত বব মার্লির সেই কালজয়ী গান ‘বাফেলো সোলজার’-এর ছন্দময় সুরকে মনে করিয়ে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন দ্রুত তার ঐতিহাসিক ২৫০তম বার্ষিকীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মহিষের এই রূপকটি বৈশ্বিক মঞ্চে এক অপ্রত্যাশিত রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে l যা এখন আর আমেরিকার সীমান্ত অঞ্চলের ঐতিহাসিক লড়াই দিয়ে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কুরবানির ধারালো ছুরির মাধ্যমে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে।
তবে দেশের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপীয়, আফ্রিকান ও এশীয় গণমাধ্যমের দিকে তাকালে আরও বড় এবং উদ্বেগজনক এক বৈশ্বিক ঐকমত্য চোখে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খামখেয়ালি শাসন পরিচালনা তাঁর ঐতিহাসিক রিপাবলিকান পূর্বসূরিদের লালন করা গণতন্ত্রের চিরন্তন আদর্শের ওপর এমন এক মারাত্মক আঘাত হেনেছে, যা হয়তো আর কোনোদিন মেরামত করা সম্ভব নয়।
এই কাঠামোগত অবক্ষয়টি প্রখ্যাত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক ব্রহ্মা চেলানির সাম্প্রতিক এক তীক্ষ্ণ মন্তব্যে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। স্বামীর অসুস্থতার কারণে মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডের আকস্মিক পদত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় চেলানি উল্লেখ করেন যে, তাঁর এই চলে যাওয়া প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মুক্ত আলোচনার ওপর একটি বড় ধাক্কা। প্রশাসনের ভেতরে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো যে কয়েকজন সংশয়বাদী অবশিষ্ট ছিলেন, তাঁদের একজনের বিদায়ের মাধ্যমে আশার শেষ আলোটুকুও নিভে গেল। ফলে, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা এখন অন্ধ ‘প্রতিধ্বনি কক্ষে’ (একই মতাদর্শের মানুষের জমায়েত) পরিণত হয়েছে, যেখানে কেবল অনুগতরা স্থান পেয়েছেন এবং যা সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত।
চেলানি একটি নির্মম সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন: সামরিক হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প একের পর এক সামরিক হস্তক্ষেপের রেকর্ড তৈরি করে চলেছেন, যেখানে কিউবা এখন তাঁর প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের পূর্ববর্তী অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে উত্তেজনা বৃদ্ধির সময় গ্যাবার্ডকে যেভাবে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, ঠিক তেমনি তাঁর এই চূড়ান্ত বিদায় আমেরিকার আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির বিরুদ্ধে শেষ অভ্যন্তরীণ বাধাটুকুকেও সরিয়ে দিল।
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার এই ধলা মহিষের প্রদর্শনীটি মূলত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক বিশাল সংকটের ক্ষুদ্র প্রতিফলন। রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণ, পররাজ্যে হস্তক্ষেপ এবং বৈশ্বিক নাট্যমঞ্চের মধ্যকার সীমারেখা যখন ক্রমাগত ঝাপসা হয়ে আসছে, তখন সময়ই বলে দেবে আসলে কারা দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছিল: এই "মহিষ প্যারোডি" বা ব্যঙ্গচিত্রের স্থানীয় রূপকারেরা, ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক আগ্রাসনকে সচল রাখা প্রতীকী "বাফেলো সোলজাররা", নাকি চেলানির মতো কৌশলগত চিন্তাবিদেরা, যাঁরা দূর থেকে আমেরিকার গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতার এই পতন দেখছেন।
শোয়েব চৌধুরী: একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, উদ্যোক্তা, লেখক, ক্রীড়া সংগঠক এবং আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক।