প্রকাশিত : শনিবার , ৯ মে ২০২৬ , বিকাল ০৪:০৫।। প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার , ৯ মে ২০২৬ , সন্ধ্যা ০৬:০৫
রিপোর্টার : মোঃ রানা মোল্লা , শিবচর, মাদারীপুর:

পদ্মার চর: প্রতিদিনই বেঁচে থাকার লড়াই


রিপোর্টার : Deshkal

কবির ভাষায় “শস্য-শ্যামল, সোনার বাংলা” তারই প্রকৃত রূপ লুকিয়ে আছে গ্রামবাংলার বুকেই। কিন্তু সেই সোনালি ছবির আড়ালে কোথাও কোথাও জমে আছে দীর্ঘ বঞ্চনার ছায়া।  খরস্রোত পদ্মার বুকে ভেসে থাকা এক টুকরো ভূমি নাম বার চর। কাগজে-কলমে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়ন হলেও বাস্তবে এটি যেন রাষ্ট্রের প্রান্তিকতারও বাইরে এক নিঃসঙ্গ জনপদ। যেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে, কিন্তু মানুষের কষ্ট বুঝতে লাগে না এক মুহূর্তও।

শিবচর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্ব শুনতে খুব বেশি নয়। কিন্তু সেই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বোঝা যায়, দূরত্ব শুধু মাইলের নয়, উন্নয়ন আর বঞ্চনারও। সেখানে প্রতিদিনই মানুষের জীবন মানে টিকে থাকার লড়াই। কাওড়াকান্দি ফেরী ঘাটে পৌঁছে প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে নৌকার দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার যাত্রা এই কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়েই পৌঁছাতে হয় বার চরে (বেপারী বাজার)। যাত্রাপথেই চোখে পড়ে নদীর ভাঙন, দিগন্তজোড়া বালুচর আর মানুষের অনিশ্চিত জীবনের গল্প।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, চরের বেশির ভাগ মানুষ জেলে ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এই জনপদের ভেতরে লুকিয়ে আছে কঠিন সংগ্রামের গল্প। ফসল ফলায়, নদীতে মাছ ধরে তবুও জীবন তাঁদের সহজ নয়। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য খাতে চরম অবহেলা সব মিলিয়ে এখানকার মানুষ সব মৌলিক সুবিধা থেকেই বঞ্চিত। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও নেই কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা। মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নেই, নেই ভালো রাস্তা, নেই বিদ্যুৎ।

জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে এই সংকট আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। অনেক সময় একাধিক দিন যোগাযোগ বন্ধ থাকে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংকট দেখা দেয় এবং বাজারদরও বেড়ে যায়।

কথা হয় মজিবর বেপারী নামের এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধের সঙ্গে। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ, কণ্ঠে জমে থাকা দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ভার। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এখানে (চরে) দুঃখের যেন শেষ নাই। হাসপাতাল নাই, শরীর খারাপ হইলে যাইতে পারি না। তাই কবিরাজই আমাদের শেষ ভরসা। আমাগো চরে এখনো বিদ্যুৎ আইলো না। গরমে পড়লে মনে হয় আগুনের ভেতরে বসে আছি। মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠিকমতো ধরে না। টিভি নাই, বাইরের দুনিয়ায় কী হয়, তাও জানি না।’

কৃষক জলিল মুন্সি বলেন, ‘মাটি ভালো, ফসলও ভালো হয়। কিন্তু সেচের ব্যবস্থা নেই। আবার ফসল ফলালেও ন্যায্য দাম পাই না। মাঝখানে মহাজনরা সব লাভ নিয়ে যায়। এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সন্ধ্যার পরই নেমে আসে অন্ধকার।’

স্থানীয় কৃষক রেজু বেপারী বলেন, এই চরের মাটি অনেক উর্বর, কিন্তু সেচের অভাবে ঠিকমতো চাষ করতে পারি না। বৃষ্টি হলে ভালো ফলন হয়, না হলে জমি ফাঁকা পড়ে থাকে। আবার ফসল ফলাইলেও বাজারে ন্যায্য দাম পাই না মাঝখানে মহাজনেরা সব লাভ নিয়ে যায়। সরকার যদি আমাগো এই কষ্টের কথা একবার ভাবতো ভালো রাস্তা, ন্যায্য দামের নিশ্চয়তা, চিকিৎসা ও বিদুুৎ ব্যবস্থা করে দিত তাহলে হয়তো আমরা একটু শান্তি পাইতাম।

চরের বাসিন্দা জুলেখা বিবি দুই সন্তানের মা। তিনি বলেন, ‘চরের জীবন পুরোটাই কষ্টের। বাজার, চিকিৎসা ও পড়ালেখা করতে খুবই কষ্ট হয়। আমার ছেলের জ্বর ও ডায়রিয়া হলে খুব ভয় লাগে। এখানে কোনো ডাক্তার নেই, ওষুধও সহজে পাওয়া যায় না।’

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা সত্যিই কঠিন। চরাঞ্চলের উন্নয়নে সরকারিভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। ধাপে ধাপে এসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ, নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর কাজ চলছে।

মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা বলেন,চরজানাজাতের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে এবং এখন থেকে যেকোনোভাবে তাঁদের এই বঞ্চনা থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে সব স্কুলে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম চালু করা হবে এবং নতুন মাদরাসা স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি কাঁচা সড়কগুলো পর্যায়ক্রমে পাকা করা, নদীশাসনের মাধ্যমে ভাঙন রোধ এবং চরজানাজাতের সঙ্গে শিবচরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারি ভাবে তাদের জন্য যতটুকু করা সম্ভব, আমরা তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করবো।