প্রকাশিত : মঙ্গলবার , ১৪ জুলাই ২০২৬ , সন্ধ্যা ০৭:২২।। প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার , ১৫ জুলাই ২০২৬ , রাত ০২:৫০
রিপোর্টার : অনলাইন ডেস্ক:

পরপারে বন্যপ্রাণীর পরম বন্ধু সিতেশ রঞ্জন দেব শ্রীমঙ্গলে গভীর শোক


রিপোর্টার : Deshkal

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এবং ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রকৃতিপ্রেমী সিতেশ রঞ্জন দেব পরলোকগমন করেছেন।

মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার রামকৃষ্ণ মিশন রোডের নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন এবং বাড়িতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। সকালে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবণতি হলে তাকে দ্রুত শ্রীমঙ্গল পলি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তিনি তিন ছেলে, চার পুত্রবধূ, চার কন্যা ও নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।

ক্লিনিক থেকে সিতেশ রঞ্জনের মরদেহ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় তার আজীবনের স্মৃতিবিজড়িত কর্মক্ষেত্র বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে। সেখানে তার পরম যত্নে চিকিৎসাধীন ও আশ্রিত আহত প্রাণীদের সামনে মরদেহ রাখা হলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রিয় অভিভাবককে শেষবারের মতো দেখতে সেখানে শত শত মানুষ ছুটে যান।

এরপর বিকেল ৩টায় শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁওয়ে তার পৈতৃক বাড়িতে মরদেহ নেওয়া হলে গ্রামবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষ তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পারিবারিক শ্মশান ঘাটে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

সিতেশ রঞ্জন দেবের বন্যপ্রাণী প্রেমের পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ও ত্যাগের ইতিহাস। তার বাবাও ছিলেন বন্যপ্রাণীপ্রেমী, যার কাছ থেকে ছোটবেলাতেই প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসার বীজ বুনেছিলেন সিতেশ বাবু।

ঐতিহাসিক সেই ঘটনা: ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে পাত্রখলা চা বাগানে বন্য শুকর তাড়াতে গিয়ে তিনি একটি বিশাল ভারতীয় ভাল্লুকের আক্রমণের শিকার হন।

ক্ষতি: ভাল্লুকের থাবায় তিনি একটি চোখ, নাক, দাঁত এবং মুখের একাংশ হারান। পুনর্জন্ম: ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) দীর্ঘ চিকিৎসা ও একাধিক প্লাস্টিক সার্জারির পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

তিনি নিজেই বলতেন, এটি তার ‘দ্বিতীয় জীবন’। আর এই পুরো দ্বিতীয় জীবনটাই তিনি উৎসর্গ করেছিলেন নির্বাক ও অসহায় প্রাণীদের সেবায়।গত চার দশকে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট লজ্জাবতী বানর, অজগর, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, চশমাপরা হনুমান, বন্য শুকর, চিল, ঈগল ও তক্ষকসহ হাজার হাজার বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সুস্থ করে তুলেছেন। শুরুতে তার বাড়িটি মানুষের কাছে ‘মিনি চিড়িয়াখানা’ নামে পরিচিত হলেও মূলত সেটি ছিল আহত প্রাণীদের উদ্ধার ও চিকিৎসাকেন্দ্র। নিজের মাছের খামারের আয় থেকে তিনি এই বিপুল ব্যয়ভার বহন করতেন।

পরবর্তীতে ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পরামর্শে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’। সুস্থ হওয়া প্রাণীদের তিনি নিয়মিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে অবমুক্ত করতেন।

তার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাব, উপজেলা প্রেস ক্লাব, পরিবেশবাদী সংগঠন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।

"সিতেশ বাবুর মতো মানুষ যুগে যুগে জন্ম নেন না। তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন নির্বাক প্রাণীদের জন্য। তার চলে যাওয়া পুরো দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।" — হরিপদ রায়, সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ (শ্রীমঙ্গল শাখা)