প্রকাশিত : মঙ্গলবার , ২০ অক্টোবর ২০২৬ , রাত ০৮:৫৯।। প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার , ২১ অক্টোবর ২০২৬ , ভোর ০৫:০০
রিপোর্টার : স্বপন কুমার সিং, নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারীর কল্যাণ ও মর্যাদার বার্তায় শচী অঙ্গনে কুমারী পূজা; হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে উদযাপিত মহানবমী


রিপোর্টার : Deshkal

দেবী দুর্গার শক্তি, পবিত্রতা ও মাতৃসত্তার আরাধনায় হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার জয়পুরে অবস্থিত পূণ্যভূমি শ্রীশ্রী শচীঅঙ্গন ধামে (শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মাতুলালয়) অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক আবহে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১১ তম  কুমারী পূজা।

​গতকাল ১৯ অক্টোবর সোমবার সকালে আয়োজিত এ পূজায় ১১ বছর বয়সী অভয়া জ্যোতি চক্রবর্ত্তীকে ‘রুদ্রাণী’ নামে কুমারী রূপে পূজা করা হয়। তিনি বাংলাদেশ স্কাউটসের উপপরিচালক অলক চক্রবর্ত্তী ও মেজর অলকা ভট্টাচার্যের প্রথম কন্যা এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

​সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে কুমারী পূজা নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃসত্তার বন্দনা এবং সৃষ্টির অন্তর্নিহিত শক্তির আরাধনার প্রতীক। এ পূজার মাধ্যমে সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, অধিকার সুরক্ষা, কল্যাণ ও অগ্রযাত্রার ইতিবাচক বার্তা তুলে ধরা হয়। নারী যেন সব ধরনের নির্যাতন ও বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে শিক্ষা, কর্ম ও নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে পারেন—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করা হয় পূজার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যে।

​সকাল সোয়া ৯টা থেকে সোয়া ১০টার মধ্যে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এ সময় ভক্তরা দেবীর চরণে প্রণাম নিবেদন করে বিশ্বশান্তি, মানবকল্যাণ ও নারীর সম্মানজনক অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ প্রার্থনা জানান।

​শ্রীশ্রী শচী অঙ্গন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ডা. সত্যকাম চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব অশোক মাধব রায়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি শ্রী অতীন দত্ত চৌধুরী।

​এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শচী অঙ্গন ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. নিবাস চন্দ্র পাল, পরিচালনা পর্ষদের সিনিয়র সহসভাপতি শ্রী কন্দর্প বণিক মিহির, বার্ষিক উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বপন দেব, সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য, রথযাত্রা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল কর, সাধারণ সম্পাদক বিষ্ণু দেব বিশাল, বাহুবল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রুহুল আমিন তালুকদার, বাহুবল মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এবং পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ বণিক দীপক চক্রবর্তীসহ সনাতনী সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও ভক্তরা।

​অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. নিবাস চন্দ্র পাল এবং সভাপতি ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী বলেন, “কুমারী পূজা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি সমাজের সর্বস্তরে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দেওয়ার একটি ইতিবাচক বার্তা।”

​পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্রী রণধীর চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক সুবীর রঞ্জন দেব জানান, পৃথিবীর সব নারীর নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং সমাজে নারী নির্যাতন বন্ধের রূপরেখা প্রচার করাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। পূজা শেষে অতিথিরা ভক্তদের শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানান।

​হবিগঞ্জ রামকৃষ্ণ মিশনে ১০৫ বছরের ঐতিহ্যে কুমারী পূজা

​একই দিনে ধর্মীয় রীতিনীতি ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে হবিগঞ্জ শহরের রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১০৫ বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যবাহী পূজাকে কেন্দ্র করে উলুধ্বনি, শঙ্খ ও মায়ের স্তুতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মিশন প্রাঙ্গণ। মিশনে আসা হাজারো দর্শনার্থীর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য, সাদা পোশাকের পুলিশ ও আনসার মোতায়েন করা হয়। মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী বেদময়ানন্দ জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও হবিগঞ্জ ও আশপাশের জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটেছে।

​শ্রীমঙ্গলে রঘুনাথপুর কালীবাড়িতে কুমারী পূজা ও সবুজবাগে ‘অভয়া’ থিম

​মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁওয়ের রঘুনাথপুর শ্রীশ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়িতে ২৯ বছরের ধারাবাহিক ঐতিহ্যে উদযাপিত হয়েছে কুমারী পূজা। অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সী কন্যাশিশুর মাঝে দেবীর মাতৃরূপ কল্পনা করে ভক্তরা প্রার্থনায় মেতে ওঠেন।

​এদিকে, শ্রীমঞ্চলের সবুজবাগ যুব দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ১৮তম বর্ষের পূজামণ্ডপে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী ও সচেতনতামূলক সাজসজ্জা। 'ভয় নয়, প্রতিবাদ হোক' এবং 'অভয়া, প্রতিবাদী নারীর কণ্ঠস্বর' শীর্ষক থিমে মণ্ডপ সাজিয়ে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, ইলা মিত্রসহ মহিয়সী নারীদের বাণী এবং সচেতনতামূলক স্লোগান দিয়ে সাজানো এই প্রতিবাদের রূপ দর্শনার্থীদের গভীরভাবে আলোড়িত করে।

​বিষ্ণুপদ ধাম ও গৌর সেবা আশ্রমেও আবাহন

​একইসঙ্গে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার তারাপাশা গ্রামের ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী বিষ্ণুপদ ধামে যথারীতি ধর্মীয় বিধান মেনে কুমারী পূজা সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নাজিরাবাদ ইউনিয়নের গোবিন্দপুর শ্রীশ্রী গৌর সেবা আশ্রমে এবারই প্রথমবারের মতো কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়। নতুন এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সৃষ্টি হয় বাড়তি উৎসাহ ও উদ্দীপনা।