প্রকাশিত : বৃহঃস্পতিবার , ২২ অক্টোবর ২০২৬ , সন্ধ্যা ০৭:৫৫।। প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার , ২৩ অক্টোবর ২০২৬ , বিকাল ০৩:২১
রিপোর্টার : নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাঁওড়ে জীবনমান উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ: চার জেলার ২৯ জলাশয়ে আধুনিকায়ন ও মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ


রিপোর্টার : Deshkal

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার প্রাকৃতিক জলাভূমি বা বাঁওড়গুলো মৎস্যসম্পদের এক বিশাল ভান্ডার। যুগের পর যুগ ধরে এই বিশাল জলমহালগুলোর ওপর নির্ভর করে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে আসছে স্থানীয় প্রান্তিক মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠী। তবে বিপুল প্রাকৃতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সময়ের পরিক্রমায় জলাভুমিগুলো নাব্যতা হারানো এবং এই অঞ্চলের সাধারণ জেলে পরিবারগুলোর জীবনমান সামগ্রিকভাবে চরম দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বৈষম্যের বৃত্তে বন্দি।

ঐতিহ্যগতভাবে বাঁওড় ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রভাবশালী অ-মৎস্যজীবী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ইজারাদারি দৌরাত্ম্যের কারণে প্রকৃত জেলেরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। নব্বইয়ের দশকে গঠিত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলোর সদস্য তালিকা দীর্ঘকাল হালনাগাদ না হওয়ায় সাধারণ জেলেরা নিজেদের জলাশয়েই নামমাত্র মজুরিতে দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। একই সাথে পলি জমে বাঁওড় ভরাট হয়ে যাওয়া, প্রজনন ক্ষেত্রে পানির সংকট এবং আধুনিক মৎস্য চাষের যান্ত্রিকীকরণের অভাবে দিন দিন মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, যা মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর আয় ও খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে।

এই প্রেক্ষাপটে, জলমহালের ওপর প্রকৃত মৎস্যজীবীদের আইনি ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সুষম লভ্যাংশ বণ্টনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে একটি টেকসই ও সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মৎস্য অধিদপ্তর “নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা” শীর্ষক একটি সময়োপযোগী প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। বাঁওড়গুলোর অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সমাজভিত্তিক টেকসই মৎস্য চাষের মাধ্যমে এই সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তনই এই উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যগুলোর অন্যতম হলো নব্বইয়ের দশকে গঠিত সমবায় সমিতিগুলোর সদস্যতালিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হালনাগাদ করা। এর মাধ্যমে অ-মৎস্যজীবী ও প্রভাবশালীদের প্রভাব বলয় ভেঙে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং জলমহালের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব ও লভ্যাংশ বণ্টনের একটি টেকসই রূপরেখা তৈরি করা হবে।

প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন পলি জমে ভরাট হয়ে পড়া বাঁওড়গুলোর গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের খনন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমসহ সারা বছর যাতে মাছের অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকে, সেজন্য বাঁওড়ের নির্বাচিত অংশ খনন খাতে ১১ কোটি ২১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছের সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে ২৯টি বাঁওড়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠায় ২ কোটি ৩২ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।

বাঁওড়ের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ৩৫টি পোনা উৎপাদন পুকুর সংস্কারের জন্য ১ কোটি ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, খামার যান্ত্রিকীকরণে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের জন্য ৬টি গভীর নলকূপ স্থাপনে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক মৎস্যজীবীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে পোনা সরবরাহ ও আধুনিক সম্প্রসারণসেবা পৌঁছে দিতে জরাজীর্ণ ৬টি বাঁওড় ব্যবস্থাপক অফিস ভবন পুনর্নির্মাণে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৮ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদে ২৯০টি বিল নার্সারি স্থাপনে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং বাঁওড়গুলোতে রুইজাতীয় ও দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কার্যক্রমে পৃথকভাবে ৭ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া প্রকল্প কার্যক্রমের তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সুবিধার্থে ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪টি ডেস্কটপ, ২টি ল্যাপটপ, ৪টি প্রিন্টার ও আনুষঙ্গিক অফিস সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এ প্রকল্প সম্পর্কে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন কমপক্ষে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এ প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে প্রকল্প মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত উৎপাদন ও স্থায়ী আয়ের দীর্ঘমেয়াদি সুফল ভোগ করতে পারবেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। তিনি আরো বলেন, উল্লেখিত ব্যয়সমূহ প্রাথমিক প্রস্তাবনা মাত্র। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মূল্যায়ন সভা (পিইসি) এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি; ফলে পিইসি সভায় অবকাঠামোগত উপযোগিতা, সরঞ্জামের বাজারদর ও ব্যয়ের সামগ্রিক যৌক্তিকতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া হবে।