রিপোর্টার : Deshkal
ক্যালেন্ডারের পাতায় গতকালই পেরিয়ে গেছে ২০ মে। কিন্তু বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি এখনো এক রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে। আজ থেকে ১০৫ বছর আগে, ১৯২১ সালের ২০ মে, চাঁদপুরের মেঘনা ঘাট ও বড় স্টেশন এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল। উপমহাদেশের অন্যতম নির্মম শ্রমিক হত্যাকাণ্ড। ‘মুল্লুকে চল’—নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি নিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন ছিল মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ, দাসত্বসদৃশ শ্রমব্যবস্থা ও অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে চা শ্রমিকদের ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণ।
বাংলায় চা শিল্পের সূচনা ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে এবং ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনীছড়ায় বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। কিন্তু স্থানীয় মানুষ কঠোর ও অমানবিক শ্রমে আগ্রহী না হওয়ায় ব্রিটিশ বাগান মালিকেরা ভারতের বিহার, পাটনা, উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থানের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে আসাম ও সিলেট অঞ্চলে নিয়ে আসেন। বলা হয়েছিল, সবুজ পাহাড়ের গাছে ‘সোনা ফলে’; সেখানে কাজ করলেই মিলবে সুখের জীবন। কিন্তু বাগানে পৌঁছানোর পরই তাদের স্বপ্ন ভেঙে যায়।
চা বাগানের শ্রমিকদের জীবন ছিল কার্যত বন্দিদশা। চা বিক্রি করে মালিকদের মুনাফা কয়েকগুণ বাড়লেও শ্রমিকদের হাতে নগদ অর্থ দেওয়া হতো না। তাঁদের দেওয়া হতো বিশেষ ‘টি-টোকেন’, যা দিয়ে কেবল বাগানের নির্দিষ্ট দোকান থেকেই পণ্য কেনা যেত। বাগানের বাইরে এই টোকেনের কোনো মূল্য ছিল না। ফলে শ্রমিকেরা এক ধরনের অর্থনৈতিক দাসত্বের মধ্যে আটকে পড়েন। সামান্য ভুলত্রুটিতেই তাদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন।
দীর্ঘ ৬৭ বছরের শোষণ ও বঞ্চনার পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নিজেদের লাভ অক্ষুণ্ন রাখতে বাগান মালিকেরা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি কমিয়ে মাত্র তিন আনা নির্ধারণ করে। এতে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। ১৯২১ সালের মে মাসে হাজার হাজার চা শ্রমিক একযোগে ঘোষণা দেন—“মুল্লুকে চল”, অর্থাৎ নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যাবেন তাঁরা।
শ্রমিকদের এই গণপ্রস্থান ঠেকাতে বাগান মালিক ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ একযোগে ট্রেন ও জাহাজের টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু দমে যাননি শ্রমিকেরা। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক পরিবার-পরিজন নিয়ে আসাম থেকে পায়ে হেঁটে চাঁদপুরের দিকে যাত্রা শুরু করেন। দীর্ঘ ও দুর্বিষহ এই যাত্রাপথে ক্ষুধা, ক্লান্তি ও মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক মারা যান বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
নানা বাধা অতিক্রম করে অবশিষ্ট শ্রমিকেরা চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে এসে পৌঁছান। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল স্টিমারে করে ত্রিপুরা হয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়া। ১৯ মে জাহাজে ওঠার সময় প্রথম দফায় তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়। আতঙ্কে অনেকে নদীতে ঝাঁপ দেন; অনেকেই স্রোতে তলিয়ে যান।
এরপর আসে ২০ মে’র সেই বিভীষিকাময় রাত। দিনভর ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত শ্রমিকেরা চাঁদপুর বড় হেড স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রথমদিকে মহকুমা প্রশাসক সুনীল কুমার সিংহ শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু পরে বাগান মালিক ম্যাকফার্সনের চাপে পরিস্থিতি বদলে যায়। গভীর রাতে গোর্খা সৈন্য ও পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। প্রশাসনের নির্দেশে ঘুমন্ত শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয় এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় অসংখ্য মানুষকে। সেই রাতে চা শ্রমিকদের রক্তে মেঘনার পানি লাল হয়ে উঠেছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে।
এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সিলেট, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। রেল শ্রমিক নেতা ও ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত আড়াই মাসব্যাপী রেল ধর্মঘটের ডাক দেন। এতে রেল যোগাযোগ কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং ব্রিটিশ প্রশাসন চাপে পড়ে যায়। আন্দোলনের জেরে প্রায় পাঁচ হাজার রেলকর্মী চাকরি হারান। শুরুতে মহাত্মা গান্ধী শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করলেও পরে ‘পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে অসহযোগ নয়’—এই অবস্থানের কারণে তিনি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায়ও মূলধারার আলোচনায় আড়াল হয়ে যেতে থাকে।
১০৫ বছর পরও চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মৌলিক চিত্র খুব বেশি বদলায়নি। চাঁদপুরের ঐতিহাসিক হেড স্টেশনে এখনো শহীদ শ্রমিকদের স্মরণে কোনো রাষ্ট্রীয় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি। তবে প্রতি বছর ২০ মে স্থানীয় চা শ্রমিকেরা নিজেদের উদ্যোগে দিনটিকে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন।
বর্তমান সময়েও চা শ্রমিকদের জীবনমান অত্যন্ত নাজুক। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে তাঁদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৭৮ থেকে ১৮৮ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি—দৈনিক মজুরি অন্তত ৩০০ টাকায় উন্নীত করা হোক। একই সঙ্গে ভূমির অধিকার নিয়েও তারা বঞ্চনার শিকার। শ্রম আইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী চাকরির মেয়াদ শেষ হলে বা কাজ করার সক্ষমতা হারালে বাগানের আবাসন ছেড়ে যেতে হয়, জমির ওপর তাদের কোনো স্থায়ী অধিকার থাকে না।
আমাদের প্রতিদিনের কাপে যে চা ক্লান্তি দূর করে, তার প্রতিটি চুমুকের পেছনে লুকিয়ে আছে লাখো চা শ্রমিকের রক্ত, ঘাম ও দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। ‘মুল্লুকে চল’ আন্দোলনের ১০৫ বছর পূর্তি আবারও মনে করিয়ে দেয়—ন্যায্য মজুরি, বাসস্থানের নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত না হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্প কখনোই পূর্ণতা পাবে না।