প্রকাশিত : বুধবার , ২৯ জুলাই ২০২৬ , রাত ০৮:২০।। প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহঃস্পতিবার , ৩০ জুলাই ২০২৬ , ভোর ০৪:৪৮
রিপোর্টার : মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :

ধ্বংসের পথে ন্যাশনাল টি


রিপোর্টার : Deshkal

-বীমা চাচা খ্যাত শেখ কবির ও লুটেরা নাফিজ শারাফতের হাতে জিম্মি ছিল চা শিল্প

-ন্যাশনাল টি কোম্পানির ২৩৯ কোটি টাকার লোকসান

-রাইট শেয়ার জালিয়াতি ও মুমূর্ষু 'Z' ক্যাটাগরিতে পতনের নেপথ্য রয়েছে অন্যরকম কাহিনী 

বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাসে একটি ঐতিহ্যবাহী নাম হচ্ছে ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড (NTCL) । ১৯৭৯ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়া এই কোম্পানিটি একসময় 'A' ক্যাটাগরির অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান থাকলেও, বর্তমানে এটি স্টক এক্সচেঞ্জের সবচেয়ে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ 'Z' (জেড) ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে । সদ্য প্রয়াত চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন (যিনি বীমা খাতের পরিচিত মুখ) এবং বিতর্কিত ব্যাংক লুটেরা পরিচালক চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের সীমাহীন অনিয়ম, লুটপাট ও দুর্নীতির কারণেই এই ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান 'ARTISAN Chartered Accountants'-এর ২০ মে ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত অডিট প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে ।

কোম্পানিটি স্বাধীনতার পূর্বে আদমজী গ্রুপের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে একে আধুনিক ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় । শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের তথ্যমতে সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের হাতে রয়েছে ৫.২২% শেয়ার [৪১]। কিন্তু ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (ICB - ২৭.২৫৬%) এবং সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের (১১.৪৯৬%) শেয়ারকে আইনিভাবে 'স্পন্সর/পরিচালক' ক্যাটাগরিতে যুক্ত করায় স্টক এক্সচেঞ্জে স্পন্সরদের মোট শেয়ার ৩৯.৪৩% দেখানো হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩১.৪৯% এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৩.৮৬% শেয়ার রয়েছে ।

শীর্ষ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদ: দুর্নীতিবাজদের সিন্ডিকেট ও বর্তমান পর্ষদের নীরবতা:

কোম্পানির বর্তমান কাঠামোগত ও আর্থিক বিপর্যয়ের মূল কারিগর সাবেক পর্ষদ এবং শীর্ষ ব্যবস্থাপনা হলেও, বিপর্যয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বর্তমানে পর্ষদে বড় ধরনের রদবদল এসেছে।

নতুন চেয়ারম্যান মামুন রশীদ ও বর্তমান পর্ষদের দায়বদ্ধতা: প্রয়াত শেখ কবির হোসেনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে বর্তমানে ন্যাশনাল টি কোম্পানির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জনাব মামুন রশীদ [২]। বর্তমান পর্ষদে প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে যুক্ত রয়েছেন সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের এমডি মো. হারুন-অর-রশীদ, আইসিবির (ICB) এমডি নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মেহেদী মাসুদুজ্জামান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার [২, ৩, ৪]। ভয়াবহ আর্থিক জালিয়াতি ও লুটপাটের চিত্র উন্মোচিত হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব মামুন রশীদ ২০২৬ সালের ২০ মে স্বাক্ষরিত সর্বশেষ অডিট রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন , কিন্তু পূর্ববর্তী শেখ কবির পর্ষদের কিংবা 'ব্যাংক লুটেরা' নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে প্রকারান্তরে তিনি সেই দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় ও অলিখিত বৈধতা দিয়েছেন। উল্টো নাফিজ সরাফাতকে নীরবে পর্ষদ থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে ।

এমডি জিয়াউল আহসানের সরাসরি সম্পৃক্ততা: কোম্পানির এই ভয়ংকর লুটপাটে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) এইচ. এস. এম. জিয়াউল আহসান সরাসরি জড়িত এবং তিনি এখনো স্বপদে বহাল আছেন । অডিট রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ৫৩ কোটি টাকার রাইট শেয়ার বরাদ্দ এবং তা থেকে ২৯ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার কাজটি "পরিচালনা পর্ষদের পূর্বানুমোদন ছাড়াই" (without approval of the Board) করা হয়েছে [৮২]। অর্থাৎ, বোর্ডের অগোচরে ম্যানেজমেন্টের প্রধান হিসেবে এমডি নিজেই এই অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের মূল কারিগর ছিলেন। এছাড়া, কোম্পানিতে উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই অসংখ্য "অনুমোদনহীন অর্থ প্রদান" (unauthorized payments) এবং জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদনে তার নিজ হাতে করা স্বাক্ষর প্রমাণ করে যে—তিনি কেবল পর্ষদের আজ্ঞাবহ ছিলেন না, বরং এই অপকর্মগুলোর সক্রিয় অংশীদার।

সিএফও মামুন মিয়ার সরাসরি দায় ও হিসাব জালিয়াতি: এই আর্থিক ধ্বংসযজ্ঞে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (CFO) মামুন মিয়া কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না, যিনি এখনো স্বপদে বহাল। অডিট রিপোর্টে স্পষ্টভাবে "হিসাব ও অর্থ বিভাগের" চরম ব্যর্থতা এবং অসংখ্য 'অনুমোদনহীন অর্থ প্রদানের' কথা বলা হয়েছে, যার প্রধান হলেন সিএফও । ৩ কোটি টাকার ভুয়া অবচয় দেখানো, ৩১ কোটি টাকার গ্র্যাচুইটি ফান্ডের হিসাব গায়েব এবং ৫৩ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ফান্ডের বেআইনি ব্যবহার—এসবই সরাসরি হিসাব বিভাগের কাজ । এমডির পাশাপাশি জেনে-বুঝে এমন জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করে তিনি সরাসরি কর্পোরেট অপরাধে অংশ নিয়েছেন।

পর্ষদ থেকে 'ব্যাংক লুটেরা' নাফিজ সরাফাতের বিদায়: কোম্পানির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের অফিশিয়াল তালিকায় বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের নাম আর নেই । তিনি 'ফাইনেন্স সফটওয়্যার লিমিটেড'-এর (২.১০০% শেয়ার) প্রতিনিধি হিসেবে পর্ষদে ছিলেন। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় জোরপূর্বক পদ্মা ব্যাংক দখল, ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, পরিবারের ৭৪টি ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার অভিযোগ ওঠার পর এই চা কোম্পানির বোর্ড থেকে তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। তবে তার এবং সাবেক পর্ষদের আমলেই কোম্পানিতে ৫৩ কোটি টাকার অবৈধ রাইট শেয়ার বরাদ্দ এবং গ্র্যাচুইটির টাকা গায়েবের মতো ঘটনাগুলো ঘটেছিল।

প্রয়াত চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের দায়: বর্তমান ধস মূলত সাবেক চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের আমলেরই সৃষ্টি। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন । আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল প্রতিষ্ঠানে তাঁর ব্যক্তিগত শেয়ার ছিল মাত্র ১,০০০টি (০.০১৫%)। অথচ এই নামমাত্র শেয়ার নিয়েই তিনি বছরের পর বছর বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং তাঁর আমলেই কোম্পানির ঘাড়ে ২৩৯ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের বোঝা চাপে।

অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতা: অডিটররা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোম্পানিতে কোনো 'ইন্টার্নাল অডিট ডিপার্টমেন্ট' বা কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা নেই। আধুনিক অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার না থাকায় হেড অফিস ও বাগানগুলোর হিসাব এখনো ম্যানুয়ালি রাখা হয়, যা জালিয়াতির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।


চা বাগান, উৎপাদন ও জমি ইজারার আইনি পরিস্থিতি:

কোম্পানিটি বর্তমানে মোট ১২টি চা বাগান পরিচালনা করে, যেখান থেকে বছরে বিপুল পরিমাণ চা উৎপাদিত হয়। বাগানগুলো হলো— ১. পাত্রখোলা, ২. লাক্কাতুরা, ৩. কুর্মা, ৪. মাধবপুর, ۵. তেলিয়াপাড়া, ৬. পারকুল, ৭. চাম্পারাই, ৮. চণ্ডীছড়া, ৯. জগদীশপুর, ১০. মদনমোহনপুর, ১১. প্রেমনগর, এবং ১২. বিজয়া [১০৭]। বাগানগুলোর জমি সরকারের কাছ থেকে ২০-৪০ বছরের জন্য ইজারা নেওয়া [১০০]। ১০টি বাগানের নবায়ন হলেও পারকুল ও প্রেমনগরের নবায়ন এখনো প্রক্রিয়াধীন [১০০]। বর্তমানে লাক্কাতুরা বাগানের জমি নিয়ে ২০টি দেওয়ানি মামলা, প্রেমনগর নিয়ে ৭টি এবং পারকুল নিয়ে ২টি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে । চণ্ডীছড়া বাগানে গাছ চুরির একটি ফৌজদারি মামলাও চলমান।

 শ্রমিকদের অধিকার বঞ্চনা ও সুযোগ-সুবিধা:

চা বাগান শ্রমিকদের চরম অসন্তোষের বাস্তব চিত্র কোম্পানির আর্থিক নীতিমালায় স্পষ্ট: গ্র্যাচুইটি ফান্ডের শূন্যতা: কোম্পানি শ্রমিকদের গ্র্যাচুইটি ফান্ড বাবদ ৩১২,৬৯২,৭৯২ টাকার (প্রায় ৩১.২৬ কোটি টাকা) দায় দেখালেও এই ফান্ডে বাস্তবে কোনো অর্থই জমা করেনি, ফলে ফান্ডটি সম্পূর্ণ ঘাটতি অবস্থায় রয়েছে।

মুনাফায় অংশগ্রহণ (WPPF): কোম্পানিটি এখনো শ্রমিকদের জন্য মুনাফায় অংশগ্রহণের তহবিল বা ডাব্লিউপিপিএফ (WPPF) গঠন করেনি, যা নিয়ে সরকারের সাথে আলোচনা চলছে ।

আর্থিক বিপর্যয়ের চরম চিত্র (২০২৪ বনাম ২০২৫):

কোম্পানির আর্থিক অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই ধসে পড়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুনে সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ: রাজস্ব ও নিট লোকসান: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির টার্নওভার ছিল ৭১৪,৮৩৮,৯৯৯ টাকা (প্রায় ৭১.৪৮ কোটি টাকা)। কিন্তু বিপুল উৎপাদন ও অর্থায়ন ব্যয়ের কারণে এক বছরেই নিট লোকসান হয়েছে ১,০৪৬,৩১৫,০৪৪ টাকা (প্রায় ১০৪.৬৩ কোটি টাকা) ।

পুঞ্জীভূত লোকসান ও ঋণাত্মক ইকুইটি: বছরের পর বছর লোকসানের ফলে কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসানের পাহাড় জমে ২,৩৯০,৯৩৩,৬৭৬ টাকায় (২৩৯ কোটি টাকা) দাঁড়িয়েছে । ফলে কোম্পানির মোট শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি বা নিট সম্পদমূল্য (NAV) ঋণাত্মক ৯৫৬,৮২২,৯৯১ টাকায় (৯৫.৬৮ কোটি টাকা) নেমে গেছে। শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ (NAV) ধসে গিয়ে ঋণাত্মক ১৪৪.৯৭ টাকায় ঠেকেছে ।

আকাশচুম্বী ঋণ: ২০২৫ সালের জুনে দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী মিলিয়ে মোট বকেয়া ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৪,৪৩২,৮০৪,৮০৮ টাকায় (৪৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা) দাঁড়িয়েছে।

নিরীক্ষকদের গুরুতর আপত্তি ও আর্থিক জালিয়াতি (২০২৫ অডিট):

২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য 'ARTISAN Chartered Accountants' নিরীক্ষা সম্পন্ন করে তাদের রিপোর্টে 'কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন' (Qualified Opinion) প্রদান করে বেশ কয়েকটি মারাত্মক জালিয়াতি চিহ্নিত করেছে-

রাইট শেয়ার জালিয়াতি: বিএসইসির (BSEC) সাবস্ক্রিপশনের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই এবং বোর্ডের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোম্পানি ২ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে ৪৪ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৪টি রাইট শেয়ার (যার মূল্য ৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা) অবৈধভাবে বরাদ্দ দেয় [৮২]। শর্ত পূরণের আগেই তারা এই তহবিলের প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পরিশোধের কাজে অবৈধভাবে ব্যবহার করেছে ।

সম্পদের অবচয়ে (Depreciation) কারচুপি: 'Bearer Plants' (চা গাছ) বাবদ ২,৩৮৮,৪৪৮,৩৪১ টাকার (২৩৮.৮৪ কোটি টাকা) সম্পদের ওপর সঠিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ না করেই আন্তর্জাতিক হিসাবমান (IAS 16) লঙ্ঘন করে ৩১,৬৩৯,০৪৭ টাকার (৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা) একটি ভিত্তিহীন থোক অবচয় দেখানো হয়েছে [৮১]। অপরিণত চারাগাছগুলোকে সরাসরি মূল সম্পদ হিসেবে দেখিয়ে কোম্পানির সম্পদ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।

আন্তঃহিসাবে গরমিল: হেড অফিস ও বাগানগুলোর মধ্যকার হিসাবে ৯,৫২৬,০৭৬ টাকার (প্রায় ৯৫ লাখ টাকা) একটি অমীমাংসিত গরমিল রয়েছে, যা প্রমাণ ছাড়াই দায় হিসেবে দেখানো হয়েছে ।


ভবিষ্যৎ টিকে থাকার শঙ্কা (Going Concern Threat):

নিরীক্ষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ন্যাশনাল টি কোম্পানির অস্তিত্ব এখন তীব্র হুমকির মুখে (Material Uncertainty Related to Going Concern) । গত চার বছর ধরে কোম্পানিটি তাদের পরিচালন কার্যক্রম থেকে পজিটিভ ক্যাশ ফ্লো (নগদ প্রবাহ) তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে । ৪৪৩ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ, নেগেটিভ ক্যাশ ফ্লো, ৯৫.৬৮ কোটি টাকার ঋণাত্মক ইকুইটি এবং সম্পদের চেয়ে দায় বহুগুণ বেশি হওয়া—একটি আসন্ন দেউলিয়াত্বের (Bankruptcy) সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

সার্বিকভাবে, ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড (NTCL) আজ একটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রায় এবং 'Z' ক্যাটাগরির মুমূর্ষু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সদ্য প্রয়াত চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং বিতর্কিত পরিচালক চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের মতো ব্যক্তিদের উপস্থিতিতেই কোম্পানিতে লুটপাটের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। কিন্তু এই লুটপাটের মূল কারিগর ও বাস্তবায়নকারী ছিলেন কোম্পানির বর্তমান এমডি এইচ. এস. এম. জিয়াউল আহসান এবং সিএফও মামুন মিয়া, যাদের হাতেই ৫৩ কোটি টাকার রাইট শেয়ার জালিয়াতি ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের ৩১ কোটি টাকা গায়েবের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান পর্ষদের নিষ্ক্রিয়তা এই দুর্নীতিবাজদের অলিখিত দায়মুক্তি দেওয়ার সামিল। ২৩৯ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসান এবং ৪৪৩ কোটি টাকার আকাশচুম্বী ঋণের বোঝা নিয়ে কোম্পানিটির দায় এখন সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি। সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং চা-শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার্থে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে হলে নতুন পর্ষদকে অবিলম্বে বর্তমান ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কাঠামোগত শুদ্ধি অভিযান নিশ্চিত করতে হবে।