প্রকাশিত : রবিবার , ১৮ অক্টোবর ২০২৬ , রাত ১১:৪৭।। প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার , ১৯ অক্টোবর ২০২৬ , ভোর ০৪:৪১
রিপোর্টার : অনলfইন ডেস্ক:

সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে ১২ সুপারিশ সম্পাদক পরিষদের


রিপোর্টার : Deshkal

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, তল্লাশি, ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ বা নজরদারির আগে আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছে সম্পাদক পরিষদ।

জরুরি ভিত্তিতে কোনো সংবাদ বা ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের অনুমোদন এবং সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষাসহ ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে সংগঠনটি।

রোববার সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সই করা বিবৃতিতে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর জন্য সুপারিশগুলো প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।

সম্পাদক পরিষদ বলেছে, প্রস্তাবিত আইন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

১২ দফা সুপারিশের প্রথমটিতে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ বা মতামতকে কেবল বিষয়বস্তু বা সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। রাজনৈতিক সমালোচনা, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি, ভোক্তার অভিযোগ কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্যও কাউকে অপরাধী করা যাবে না। মতপ্রকাশের সঙ্গে যুক্ত কোনো অপরাধ অজামিনযোগ্য রাখা যাবে না।

দ্বিতীয় সুপারিশে সাংবাদিকের পেশাগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ ও নজরদারির আগে আদালতের অনুমোদন নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের অনুমোদন বা পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ ধরনের মামলা জামিনযোগ্য রাখার কথাও বলেছে পরিষদ।

তৃতীয় সুপারিশে ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করার দাবি জানানো হয়েছে। ভুল, অসম্পূর্ণ বা অযাচাইকৃত তথ্যকে শুধু এসব কারণে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। বুলিং, মানহানি, যৌন হয়রানিসহ ‘অস্পষ্ট’ অপরাধগুলোর পরিষ্কার সংজ্ঞার কথাও বলা হয়েছে সুপারিশে।

চতুর্থ সুপারিশে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, পরিবেশগত ক্ষতি, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার ও সরকারি ব্যয়সহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আইনি সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে।

পঞ্চম সুপারিশে সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা সরকারি নীতির সমালোচনাকে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার দাবি জানিয়েছে পরিষদ। একই সঙ্গে 'রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা'র মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ বাদ দেওয়া এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ করার মতো বিষয়গুলোর স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

ষষ্ঠ সুপারিশে অনলাইনে সংবাদ, পোস্ট, ভিডিও বা অন্য কনটেন্ট অপসারণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ও লিখিত কারণ জানানোর কথা রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং প্রতিটি আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে কনটেন্ট ব্লক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিচারিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে। ব্লক বা অপসারণের তথ্যও প্রকাশ করতে হবে।

সপ্তম সুপারিশে অনলাইনে মানহানির অভিযোগকে নতুন ও কঠোর সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে প্রেস কাউন্সিলে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

অষ্টম সুপারিশে সংবাদ প্রকাশ, মতপ্রকাশ বা মানহানিসংক্রান্ত অভিযোগ মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিচার না করার দাবি জানানো হয়েছে।

নবম সুপারিশে কোনো একটি প্রতিবেদনের জন্য পুরো সংবাদমাধ্যম বন্ধ, নিবন্ধন বাতিল বা প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক শাস্তি না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয় প্রেস কাউন্সিলের আওতায় আনার সুপারিশও করেছে পরিষদ।

দশম সুপারিশে সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। কোনো সাংবাদিককে তার তথ্যসূত্রের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করা যাবে না।

একাদশ সুপারিশে সাংবাদিকতার পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা বা সংবাদ প্রকাশসংক্রান্ত বিরোধে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিয়ে আগে প্রেস কাউন্সিলের অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এ জন্য ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রেস কাউন্সিলের কার্যক্রম আধুনিকায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

দ্বাদশ সুপারিশে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেছে পরিষদ। কাউন্সিলে সাইবার নিরাপত্তা, আইন, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তদন্ত, গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের ওপর কাউন্সিলের তদারকি থাকতে হবে।

সম্পাদক পরিষদ বলেছে, সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল সাংবাদিকতা পৃথক বিষয়। প্রস্তাবিত আইনে এসবের সীমারেখা স্পষ্ট না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে আইনটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

এদিকে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। একই সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, এ হত্যাকাণ্ড স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জনগণের জানার অধিকারের ওপর আঘাত। হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্তের পাশাপাশি পেছনে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা সাংবাদিকতাসংশ্লিষ্ট কোনো বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে পরিষদ। নিহত সাংবাদিক আগে কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, সেটিও তদন্ত করতে বলেছে সংগঠনটি। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব-প্রতিপত্তি বিবেচনা না করে সবাইকে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। একই সঙ্গে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।