প্রকাশিত : শনিবার , ১৮ এপ্রিল ২০২৬ , বিকাল ০৫:২৬।। প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার , ১৯ এপ্রিল ২০২৬ , বিকাল ০৫:০০
রিপোর্টার : মোঃ বজলুর রহমান আনছারী

এস এস সি ও সমমান পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপন : প্রয়োজন অভিন্ন নীতিমালা


রিপোর্টার : Deshkal

আসছে ২১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা। সারা দেশে এস. এস. সি/এস. এস. সি (ভোক)/দাখিল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ । দেশের এই বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে আয়োজনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডসমূহ চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে এই পাবলিক পরীক্ষা আয়োজনে এ বছর নতুন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সকল পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ভেন্যু কেন্দ্র বাতিল, কেন্দ্র বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের নিজ কেন্দ্রের বাইরে পার্শ্ববর্তী কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, কেন্দ্রের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষকগণ পার্শ্ববর্তী কেন্দ্রে কক্ষ প্রত্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন, নিঃশব্দ বহিষ্কার (Silent expulsion) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । বর্তমান মন্ত্রী পরিষদে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রী ড.আ ন ম এহছানুল  হক মিলন  ইতোমধ্যেই সকল শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিবগণের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছেন। পরীক্ষার সংগে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে ১৮ এপ্রিল অনলাইন প্লাটফর্মে যুক্ত হয়ে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পরপরই পরীক্ষায় অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীর উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালীন পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধে হেলিকপ্টারে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। পরীক্ষায় অনিয়ম বা নকলে জড়িতদের বহিষ্কারের পাশাপাশি থানা হাজতে প্রেরণ করারও নজির রয়েছে। নকল প্রতিরোধে তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা সর্বমহলে নি:সন্দেহে প্রশংসনীয় ছিল। ২০০১ থেকে ২০০৬ এর ধারাবাহিকতায় পূর্ববর্তী কয়েক বছর ঢালাও ভাবে পরীক্ষায় অনিয়ম বা নকল হয়েছে এটি বলা একেবারেই সমীচীন নয়। তবে কোথাও কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় ভূমিকার অনুপস্থিতি বা দুর্বলতার কারণে অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি এটি বলা যাবে না। তাছাড়া ২০১২ সনের কারিকুলামে পরীক্ষায় নকল করার মতো সুযোগও তুলনামূলক কম ছিল। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক সমাজসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন করেছে বার বার। বিগত সরকারের শেষ কয়েক বছর প্রশ্ন ফাঁস রোধে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বিশেষ করে পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট পূর্বে পরীক্ষার্থীদের নিজ নিজ কক্ষে প্রবেশ ও আসন গ্রহণের পর এস এম এস এর মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের সেট কোড সংশ্লিষ্ট বোর্ড থেকে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে কেন্দ্র সচিবের মোবাইলে প্রেরণ প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ফলপ্রসূ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়। 

‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা, ২০২১’ অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকার। ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে নতুন এ শিক্ষাক্রম চালু করা হয়। তাতে একদিকে যেমন ছিল না পরীক্ষার চাপ, তেমনি ছিল না বিভাগ-বিভাজনও (বিজ্ঞান, মানবিক, বাণিজ্য)। সবাই একই বই পড়েছে। ২০২৬ সালে এ শিক্ষার্থীদের দিয়েই নতুন ধারার সেই শিক্ষাক্রমে এস এস সি ও সমমান পরীক্ষা নেয়ার ‘ফায়ার টেস্ট’ র পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। সেভাবে তাদের নম্বর বন্টনের পদ্ধতিও নির্ধারণ করা হয়েছিল। যারা ২০২৬ সনের পরীক্ষার্থী, তারা ২০২৪ সনের আগস্ট মাস পর্যন্ত নতুন শিক্ষাক্রমের বই ও কারিকুলাম মেনে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেছে। 

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ এর সেপ্টেম্বরে নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল ঘোষণা করে অন্তবর্তী সরকার। ফিরে যেতে হয় ২০১২ সনের শিক্ষাক্রমে। ডিসেম্বরে পুরনো সৃজনশীল পদ্ধতিতে বার্ষিক পরীক্ষাও নেয়া হয়। মাত্র এক বছর কয়েক মাসের প্রস্তুতিতে ২০২৬ সনের পরীক্ষার্থীরা ২১ এপ্রিল থেকে পরীক্ষার হলে বসবে। একে তো একটি পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শেষ করতে যে সময় পাওয়ার কথা তার কিছুটা হলেও কমতি ছিল এ বছরের পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। 

উপরোন্ত নতুন পদক্ষেপসমূহ পরীক্ষার্থীদের উপর বাড়তি মানসিক চাপ কিছুটা হলেও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ভেন্যু কেন্দ্র বাতিল হওয়ায় কেন্দ্র বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের কোন কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। যে সকল উপজেলা সদরে একটি কেন্দ্র রয়েছে, সেখানেই এই সমস্যাটি প্রকট। মূলত ভেন্যু কেন্দ্রগুলো স্থাপিত হয়েছিল কেন্দ্র বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে। দীর্ঘদিন যাবত মূল কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে পার্শ্ববর্তী কোন প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীসহ অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীদের সমন্বয়ে ভেন্যু কেন্দ্র পরিচালিত হয়ে আসছে। এ বছরই ঘটছে এর ব্যতিক্রম। এস এস সি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হলেও এস এস সি (ভোক) ও দাখিল পরীক্ষার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের আওতায় দাখিল পরীক্ষার কেন্দ্র পূর্বে নিজ প্রতিষ্ঠানে হলেও এ বছর নিকটবর্তী কোন কেন্দ্রে অথবা কেন্দ্রের কাছাকাছি কোন প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র প্রতিস্থাপনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আবার কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় এস এস সি (ভোক) পরীক্ষার কেন্দ্র পূর্বের নিয়মেই কেন্দ্র বিদ্যালয়েই সকল পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। তিন শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপনে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

শুধু পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে তিন বোর্ডের ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত তা নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য সময়ে সময়ে জারিকৃত বিভিন্ন পরিপত্র ও নীতিমালার মধ্যে নানা অসঙ্গতি প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা এবং ম্যানেজিং কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অসঙ্গতি। এস.এস.সি ও সমমান পরীক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে যে সকল নতুন উদ্যেগ হাতে নেয়া হয়েছে; সামনের দিনগুলোতে তিনটি অধিদপ্তর ও বোর্ডসমূহের পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তসমূহ বিশেষ করে পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন অভিন্ন নীতিমালার ভিত্তিতে প্রণীত হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই উপকৃত হবে।

লেখক : শিক্ষা গবেষক