• ঢাকা
  • শুক্রবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ভোর ০৪:৩২
শিরোনাম
হোম / মতামত
রিপোর্টার : স্টাফ রিপোর্টার:
উচ্চাভিলাষী নয়, বিশেষজ্ঞদের দাবি সময়োপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন

উচ্চাভিলাষী নয়, বিশেষজ্ঞদের দাবি সময়োপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন

প্রিন্ট ভিউ

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক রূপরেখা ঘোষণা করেছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেছেন—স্পষ্ট, সময়োপযোগী  অর্থায়নসমৃদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এসব প্রতিশ্রুতি কাগুজে লক্ষ্য হয়েই থেকে যেতে পারে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি,এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ —সবার ইশতেহারেই অর্থনৈতিক সংস্কার, রপ্তানি সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ২০৪০ সালের মধ্যে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। অন্যদিকে বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে, যা তারা “অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ” হিসেবে উল্লেখ করেছে। দলটি কাঠামোগত সংস্কার, রাজস্ব শৃঙ্খলা, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যখন চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে, তখন এসব ইশতেহার আগামী সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এলডিসি উত্তরণের পর উন্নত বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা ধীরে ধীরে হারাতে হবে, যা রপ্তানি, বিনিয়োগ ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ মুর্তুজা আসিফ এহসান বলেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো গভীর অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছে।

তার ভাষ্য, “জামায়াত দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে বিএনপি তুলনামূলকভাবে একটি কাঠামোবদ্ধ রূপরেখা দিয়েছে, যেখানে কাঠামোগত সংস্কার, রাজস্ব শৃঙ্খলা ও আর্থিক সুশাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।”

তবে তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনা, বেসরকারি খাতের টেকসই অংশগ্রহণ এবং স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনীতি অপরিহার্য—যা ইশতেহারে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

“মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়াতে সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক দলগুলো এখন স্বীকার করছে—এটাই ইতিবাচক,” যোগ করেন তিনি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, লক্ষ্য নির্ধারণই যথেষ্ট নয়; বরং বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি। তার মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, যা “জরুরি ও অনিবার্য।”

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, ইশতেহারে সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপের কথা থাকলেও ব্যবসা-পরিবেশ উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা পরিষ্কার নয়। তিনি কাস্টমস আইন-২০২৩ ও লজিস্টিকস আইন-২০২৫ বাস্তবায়নের বিষয়ে আরও স্পষ্ট অঙ্গীকারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা, কর্মক্ষেত্রের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং মেধাস্বত্ব অধিকার (আইপিআর) নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

“আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না হলে কোনো পরিকল্পনাই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে না,” মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রধান চাহিদা হলো ঝামেলামুক্ত ও সহায়ক ব্যবসা পরিবেশ। নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি ব্যাংক সুদের হার হ্রাস, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিচারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

পারভেজ বলেন, তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের বিকল্প নেই। তবে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, হালাল পণ্যসহ নতুন খাতে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য বাজারের সঙ্গে আরও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও ইপিএ করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পৃথকীকরণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখন জোরদার করতে হবে। এলডিসি উত্তরণের পর বিশেষ করে আরএমজি খাতের জন্য আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ ইতিবাচক হলেও, বাস্তবায়নে সময়সীমা, অর্থায়ন কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত না হলে এসব ভিশন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

মতামত

আরও পড়ুন