১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ ভয়ংকরভাবে স্পষ্ট—এটি আর কেবল নিরাপত্তা শঙ্কার নির্বাচন নয়, এটি রক্তপাতের আশঙ্কায় ঘেরা এক ভয়াবহ বাস্তবতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও সমর্থক হত্যার ঘটনা প্রমাণ করছে, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা আর আশঙ্কা নয়—এটি ইতোমধ্যেই ঘটমান সত্য।
নির্বাচনী সহিংসতার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি একাধিক ঘটনায় গুলিতে নিহত হয়েছেন বিভিন্ন দলের প্রতিপক্ষের নেতা ও তাদের দলের সমর্থকরা। ওসমান হাদি, বিএনপির ও জামাতের কর্মী সমর্থকেরা—এসব কি বিচ্ছিন্ন অপরাধ? নাকি এগুলোই প্রমাণ করছে যে নির্বাচনকে ঘিরে শংকা বা উৎকন্ঠা কতটা ব্যাপক হয়ে পড়েছে?
গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। অথচ আজ বাংলাদেশে ভোটের মাঠে নামা মানেই অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাজি রাখা। যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই নির্বাচন কার জন্য, আর কিসের বিনিময়ে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব হত্যাকাণ্ডের পরও দায়িত্বশীল মহল থেকে কার্যকর জবাবদিহি বা দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপের অভাব। বারবার বলা হয়, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে’। কিন্তু বাস্তবে যখন নির্বাচনের আগে-পরে রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের লাশ পড়ে থাকে, তখন সেই বক্তব্য কেবল বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।
ভোটার নিরাপত্তার প্রশ্ন এখানে আরও গভীর। যদি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মীরাই নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ ভোটার—বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—কীভাবে নিজেদের নিরাপদ ভাববে? ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথ যদি আতঙ্কের হয়, তবে ভোটাধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে।
নির্বাচনী কর্মকর্তারাও এই সহিংস বাস্তবতার বাইরে নন। চাপ, হুমকি ও সহিংসতার মধ্যে কাজ করে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এই ভয়াবহ ফারাকই আজ সবচেয়ে বড় সংকট।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গুজব, উসকানি ও ডিজিটাল বিভ্রান্তি—যা সহিংসতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। কিন্তু এই ঝুঁকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন আয়োজন নয়, বরং নাগরিকের জীবন রক্ষা করে নির্বাচন নিশ্চিত করা। যখন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটে, তখন সেটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। এই ব্যর্থতা অস্বীকার করে সামনে এগিয়ে গেলে ইতিহাস দায় চাপাবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই আর কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আয়োজন নয়। এটি একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—রাষ্ট্র কি গুলির রাজনীতি থামাতে পারবে, নাকি আরও একবার রক্তের দায় নিয়ে একটি নির্বাচন পার করে দেবে?
লেখকঃ প্রকৌশলী মোঃ নাজমুল হুদা মাসুদ, মেইন্টেইন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার | সাইবার সিকিউরিটি এনালিস্ট (SB-CIRT) স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ ও জয়েন্ট সেক্রেটারি (একাডেমিক), বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি