দলবাজ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরাজ করছে বদলি ও চাকরিচ্যুতি আতঙ্ক
প্রিন্ট ভিউ
প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভসার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিএএসএ) প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও জামায়াতপন্থীদোসর কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণের দাবি জানিয়েছে।
তাঁদের জায়গায়যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যাঁরা অতীতে বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের পদোন্নতিদিয়ে পদায়নের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। তাঁরা এ-ও দাবিকরেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে যেসব আমলা অবস্থান নিয়ে পতিতসরকারকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছেন এবং এর মধ্যে যাঁদেরবিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হয়েছে, তাঁদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। উল্লিখিতদাবির বিষয়টি সরকারের শীর্ষমহলকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থানেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. বাবুল মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে দোসরকর্মকর্তাদের অপসারণ ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বঞ্চিতকর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ পদায়নের দাবি জানিয়ে জনপ্রশাসন সচিবস্যারের সঙ্গে দেখা করেছি। আমরা বলেছি, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ওআমরা বঞ্চিত ছিলাম। এমনকি গত দেড় বছরেও বঞ্চিত করা হয়েছে।আওয়ামীর জায়গায় জামায়াতি দোসর বসেছে।
কোনো দলীয় দোসর চাই না। দলনিরপেক্ষ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়েদোসরমুক্ত প্রশাসন চাই। সচিব স্যার আমাদের কথা মনোযোগ সহকারে শুনে প্রশাসনের শীর্ষমহলকে জানানো এবং ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসদিয়েছেন।’
এর আগে রবিবার সকালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহসানুল হকের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ও শিল্পসচিব ওবায়দুর রহমান এবং সংগঠনের মহাসচিব ও পরিকল্পনা কমিশনেরঅতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিয়ার নেতৃত্বে ২৫ থেকে ৩০ সদস্যের একটিপ্রতিনিধিদল বৈঠক করে।
বৈঠকে সংগঠনের নেতারা ছাড়াও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অনেকে উপস্থিতছিলেন। বৈঠক সূত্র জানায়, মূলত প্রশাসনের সংস্কার এবং নিরপেক্ষতাবজায় রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানানো হয় জনপ্রশাসন সচিবেরকাছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বিগত সরকারের সময় জনপ্রশাসনমন্ত্রণালয়ের এপিডি (নিয়োগ, পদায়ন ও প্রেষণ) উইং এবং বিভিন্নগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে যেসব ‘ফ্যাসিস্ট’ কর্মকর্তা কর্মরত ছিলেন, তাঁদেরঅবিলম্বে সরিয়ে দিতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতিথেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে ‘রিভিউ’ প্রদানের মাধ্যমেদ্রুত পদোন্নতি নিশ্চিত করে পদায়ন দিতে হবে। প্রশাসনে গতিশীলতাআনতে যোগ্য ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের সচিব হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
কোনো ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তা যেন কোনো রাষ্ট্রীয় শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতেনা পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধজানানো হয়।
এ ঘটনা এবং সদ্য সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগবাতিল হওয়ায় প্রশাসনে আওয়ামী ও জামায়াতপন্থী দোসর কর্মকর্তাদেরমধ্যে চাকরিচ্যুতি ও বদলি আতঙ্ক দেখা নিয়েছে। বিশেষ করে গত দেড়বছরে প্রশাসনে যেসব কর্মকর্তা দলবাজি করেছেন, এ ঘটনায় তাঁরা খুবইউদ্বিগ্ন। অনেকে স্বেচ্ছায় নিরাপদ ও কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন পেতেতদবির করছেন। কেউ কেউ ফের নতুন করে জাতীয়তাবাদী সাজার চেষ্টাকরছেন। বিএনপি ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সূত্র ধরে আশ্রয়খোঁজার চেষ্টা করছেন। শিক্ষাজীবনে একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বদেওয়া প্রশাসনের কর্মকর্তা ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সচিবদের(একান্ত সচিব) পিএসের দায়িত্ব পালন করা অনেকে ব্যক্তিগতনথি-ফাইল গুছিয়ে রেখেছেন। যেকোনো সময় তাঁদের বদলি করা হবেবলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।
নাম প্রকাশ না করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনেরএকাধিক নেতা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের বেশির ভাগ উপদেষ্টা ওসচিবের পিএস এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগসহপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে একটি সংগঠনের সাবেক নেতারাদায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা প্রকাশ্যে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের সমর্থকবা নিরপেক্ষ দাবি করলেও বাস্তবে একটি বিশেষ দলের সমর্থক। মাঠপ্রশাসনেও তাঁদের আধিক্য অনেক বেশি। তাঁদের অপসারণ করারজন্যই সচিবকে বলা হয়েছে।
এর আগে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীনসিনিয়র সচিব মোখলেস উর রহমানের সঙ্গে দেখা করে প্রায় অভিন্ন দাবিজানিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের নেতারা।সংগঠনটির সভাপতি সাবেক সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। যিনিবর্তমানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একান্ত সচিব (পিএস)।তিনি বলেছিলেন, প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা আওয়ামীফ্যাসিবাদীদের দ্রুত অপসারণ করতে হবে। ২০১৪ সালের জোরজবরদস্তির নির্বাচন, ২০১৮ সালের দিনের ভোট আগে রাতে সম্পন্ন এবং ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে যেসব ডিসি দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।দেশপ্রেমিক অবসরপ্রাপ্ত বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দেশের সেবা করার সুযোগদিতে হবে।
এর আগে গত বছরের ১৯ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদসম্মেলন করে পাঁচ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানায় সংগঠনটি। লিখিতবক্তব্যে সংগঠনটির সভাপতি বলেছিলেন, প্রশাসনে যাঁরা ফ্যাসিস্টদেরদোসর ও দুর্নীতিপরায়ণ, তাঁদের অবিলম্বে চাকরি থেকে অপসারণ এবংআইনের আওতায় আনতে হবে। ফ্যাসিস্টের দোসর ও দুর্নীতিপরায়ণকর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও পদায়নে যাঁরা পৃষ্ঠপোষকতা করছেনএবং করবেন, তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তারও আগে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের হয়ে প্রশাসনেরযেসব কর্মকর্তা গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের দ্রুত অপসারণকরে সৎ পদঞ্চিতদের দায়িত্বে নিয়ে আসতে হবে। জাতীয় প্রেস ক্লাবেজাতীয় পার্টির (একাংশ) চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমদের নবমমৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভায় তিনি এ কথা বলেন।
অন্যান্য