সমাজে সাংবাদিকতার ভূমিকা পবিত্র এবং অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে, তারা ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন, জনগণের জানার অধিকার রক্ষা করবেন এবং এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবেন যেখানে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্য জয়ী হতে পারে। তবে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে উত্তেজনা, অবিশ্বাস, ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা চিহ্নিত হয়ে আসছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা,গণমাধ্যম উদ্যোক্তাদের, সাংবাদিকদের ভীতি প্রদর্শন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়গুলো দেশের গণতন্ত্রের অবস্থা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে বিতর্ক আরও তীব্র করে তুলেছে।
সাহসী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে আধুনিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন পর্যন্ত, সাংবাদিকরা প্রায়শই রাজনৈতিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে দাঁড়িয়েছেন। তা সত্ত্বেও, আজকের এই পেশাটি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ, কর্পোরেট স্বার্থ, ডিজিটাল ভীতি প্রদর্শন এবং খোদ গণমাধ্যম শিল্পের ভেতরের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে প্রচণ্ড চাপের সম্মুখীন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেশের গণমাধ্যম ক্ষেত্রের দুর্বলতাগুলোকে আরও বেশি উন্মোচিত করেছে এবং সাংবাদিকদের পাশাপাশি গণমাধ্যম মালিকদের মধ্যে ঐক্য, নৈতিক দায়িত্ব ও পেশাগত সংহতির জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক উদ্বেগের একটি ছিল গণমাধ্যম উদ্যোক্তাদের ও
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা। অনেক রিপোর্টার, সম্পাদক এবং গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করেছেন যে, হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে এসব সাজানো মামলা ব্যবহার করা হয়েছে। এই মামলাগুলোর মধ্যে প্রায়শই সাইবার অপরাধ আইন, মানহানির ধারা বা জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা দাবি করেছেন যে, কেবল অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ, দুর্নীতি ফাঁস বা রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করার কারণেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে সাংবাদিক,ব্যবসায়ী
এবং শিক্ষাবিদদের ওপর কাল্পনিক হত্যা মামলাও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সমঅধিকার এবং আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও যোগ করেন যে, গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করা উচিত এবং কারাগারে থাকা সমস্ত গণমাধ্যমকর্মীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত। তবে এই দাবি এবং মন্তব্যগুলো আরও অনেক আগেই করা উচিত ছিল, যখন পক্ষপাতদুষ্ট ও কলুষিত রাষ্ট্রযন্ত্র একে একে সাংবাদিক,
নিরীহ ব্যবসায়ীদের এবং শিক্ষাবিদদের আটক করছিল। এমনকি ড.ইউনুসের প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকার জন্য আওয়ামী আমলের সাজানো মামলায় দেশকাল সম্পাদককে জেলে পুরে দেয়া হয়েছে l
একটি কেস স্টাডি উল্লেখ না করলে বিবেকের কাছে দায় থাকবে l সুশাসনের বিষয়ে অতীতে দ্য ডেইলি এশিয়ান এইজ-এ প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তৎকালীন সরকার সতর্ক হয়নি। উল্টো ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের নেতারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে এশিয়ান এইজ-এর সম্পাদকমণ্ডলীর চেয়ারম্যানকে শায়েস্তা করার জন্য অনৈতিক দাবি করেছিলেন। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই সময়কার গভর্নর ফজলে কবির তাতে যুক্ত ছিলেন l কারণ, একটি সিন্ডিকেট মিলে কীভাবে ব্যাংক ও আর্থিক খাত লোপাট করার ষড়যন্ত্র করছিল, সে বিষয়ে অগ্রিম সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছিল এশিয়ান এইজ। আমি নিজেও ছিলাম এর ভুক্তভোগী ও নীরব সাক্ষী। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং ডিজিএফআই তখন এই জঘন্য কাজটি করেছিল l দীর্ঘ দিন ধরে একটি ভয়ানক আতঙ্ক বিরাজ করছিল।
এমনকি বিগত ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময় এশিয়ান এইজ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন l
একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল বিডিনিউজ২৪-এর সম্পাদনা পর্ষদের প্রধানের বিরুদ্ধে যিনি এডিটরস গিল্ডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আর এটি করা হয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এখানে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজকের মিডিয়া সিন্ডিকেটের নেতারা সেদিন এগিয়ে আসেননি। অথচ তারাই ১/১১-এর সময়ে নিজেদের বিতর্কিত ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আরও বিশদভাবে তুলে ধরব।
বেশিরভাগ শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকরা সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেননি যা মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে মিডিয়া হাউস এবং পত্রিকার মালিকদের পদদলিত করেছিল। এই ধরনের নীরবতা গণমাধ্যমের জন্য আত্মঘাতী।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিপুল সংখ্যক সংবাদপত্র ও মিডিয়া এজেন্সির দ্বারা তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছেন, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো সাংবাদিককে নিপীড়ন করার জন্য প্রতিশোধমূলক কিছুই করেননি।
এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে, সাংবাদিক এবং মিডিয়া উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংহতি আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রয়োজন। সবশেষে, উগ্র জনতা কর্তৃক কীভাবে কবর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল তা আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। সংবাদপত্রগুলো যদি হাত ধরাধরি করে কাজ করতে না পারে, তবে আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে; যেমনটা মার্টিন লুথার কিং একবার বলেছিলেন, “আমাদের ভাইদের মতো একসাথে বাঁচতে শিখতে হবে, অন্যথায় বোকার মতো একসাথে ধ্বংস হতে হবে।”
নাসির উদ্দিন শাহ ‘দ্য এশিয়ান এইজ’-এর প্রধান প্রতিবেদক।