বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহ পরিদর্শন করেছেন।
বুধবার (৬ মে) দুপুরে তিনি ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চলমান মানবিক কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী ক্যাম্পে পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সেবার বিভিন্ন কার্যক্রমেউচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। এর মধ্যে ছিল বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-এর খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম এবং ক্যাম্প-৪ এ অবস্থিত এলপিজি (LPG) বিতরণ কেন্দ্র। তিনি ক্যাম্প-৪ এর সম্মেলন কক্ষে রোহিঙ্গা তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এ সময় তিনি তরুণদের ক্ষমতায়ন ও সহনশীলতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত করেন।
পরে প্রতিনিধিদল ক্যাম্প-৮ডব্লিউ-এ পরিচালিত এমএসএফ (MSF) হাসপাতাল, ক্যাম্প-১৮-এ কোডেক (CODEC) পরিচালিত একটি শিক্ষা কেন্দ্র এবং কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পে ইউনিক্লো (UNIQLO) উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে ক্যাম্পে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রমের একটি সমন্বিত চিত্র উঠে আসে।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (RRRC) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।
বিকেলে চলমান মানবিক কার্যক্রম নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ব্রিফিং সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় এনজিও এবং আইএফআরসি (IFRC) ও আইসিআরসি (ICRC)-সহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক অংশীদারদের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সভায় সমন্বয়, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অগ্রাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
পরে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু জন্ম নিচ্ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেই এই সফর।
তিনি জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই এ সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান। অতীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার সফলভাবে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। তবে বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও সীমান্তের জটিলতার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার, আরাকান আর্মি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ভারত, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহ, মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত আলোচনা চলছে, যাতে এই সংকটের বহুপাক্ষিক সমাধান নিশ্চিত করা যায়।
তিনি উল্লেখ করেন, এই সংকট সমাধানে কেবল কূটনীতি বা রাজনৈতিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; বরং সমন্বিত বহুপাক্ষিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ধাপে ধাপে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য বাংলাদেশ সরকার সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করা জরুরি। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য সংকট, শিক্ষা কার্যক্রমে ঘাটতি এবং বাসস্থানের সমস্যাসহ নানা চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি আগত নতুন রোহিঙ্গাদের জন্যও পর্যাপ্ত আশ্রয়ের অভাব রয়েছে।
তিনি জানান, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। একই সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী—বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী—সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে, যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদে রাখা সম্ভব হয়।
শেষে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার হলে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হবে।