• ঢাকা
  • মঙ্গলবার , ৯ জুন ২০২৬ , রাত ১১:৫৫
শিরোনাম
হোম / মতামত
রিপোর্টার : মোঃ নাজমুল হুদা মাসুদ:
কুকুরপ্রেমীদের উদাসীনতা, আতঙ্ক ও জলাতঙ্ক

কুকুরপ্রেমীদের উদাসীনতা, আতঙ্ক ও জলাতঙ্ক

প্রিন্ট ভিউ

 সভ্য সমাজে প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ একটি মানবিক গুণ। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে মানুষ যেমন পোষা প্রাণীকে পরিবারের সদস্য হিসেবে লালন-পালন করে, তেমনি তাদের নিয়ন্ত্রণ, পরিচর্যা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে কুকুর পালনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জাতের পোষা কুকুর নিয়ে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ, বিভিন্ন পেট ক্যাফে কিংবা পোষা প্রাণীকেন্দ্রিক কমিউনিটির বিস্তার এ সংস্কৃতির জনপ্রিয়তার প্রমাণ বহন করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি যে সামাজিক দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ফলে কুকুরপ্রেমীদের একাংশের উদাসীনতা আজ সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং জলাতঙ্কের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকিও বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কুকুরের কামড়ে মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। একটি ছোট শিশু যখন স্কুলে যাওয়ার পথে কিংবা কোনো বৃদ্ধ মানুষ যখন সকালের হাঁটাহাঁটির সময় একটি নিয়ন্ত্রণহীন কুকুরের ধাওয়ার শিকার হন, তখন সেটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং জননিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি দুর্বল চিত্র। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে কুকুরের মালিকেরা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার চেষ্টা করেন। কেউ যদি ভয়ে সরে যেতে চান, তখন বলা হয়, “ভয় পাবেন না, কিছু করবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি প্রাণীর আচরণ সব সময় পূর্বানুমান করা সম্ভব নয়।

অনেক কুকুরপ্রেমী নিজেদের পোষা প্রাণীকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই ভালোবাসা যদি অন্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তাহলে সেটি আর ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না; বরং সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়। বর্তমানে শহরের বিভিন্ন পার্ক, খেলার মাঠ ও আবাসিক এলাকায় দেখা যায়, অনেকেই কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হন, কিন্তু তাদের হাতে শক্ত লিশ থাকে না কিংবা কুকুরের মুখে সুরক্ষামূলক মাজল ব্যবহার করা হয় না। অনেক সময় কুকুর হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে পথচারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কিংবা মোটরসাইকেল আরোহীদের ধাওয়া করে। দুর্ঘটনার ঝুঁকিও এতে বেড়ে যায়। অথচ উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পোষা প্রাণীকে জনসমাগমস্থলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। নিবন্ধন, বাধ্যতামূলক টিকাদান, লিশ ব্যবহার এবং প্রয়োজনে মুখে নিরাপত্তা আবরণ পরানো আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে।

জলাতঙ্ক বা রেবিস পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ ভাইরাসজনিত রোগ। একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে এই রোগে মৃত্যুহার প্রায় শতভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কুকুরের কামড়ের মাধ্যমেই অধিকাংশ জলাতঙ্ক সংক্রমিত হয়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। কারণ, পোষা কুকুরের যথাযথ টিকাদান নিশ্চিত না করা এবং পথকুকুর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর অন্যতম দায়িত্ব হলো পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা। বাস্তবে অনেক এলাকায় বছরের পর বছর কোনো টিকাদান কার্যক্রম দেখা যায় না। পথকুকুরের সংখ্যা বাড়লেও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয় না। এতে একদিকে প্রাণীগুলো নিজেরাই ঝুঁকিতে থাকে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও জলাতঙ্কের আশঙ্কা বাড়ে।

পোষা কুকুরের মালিকদের ক্ষেত্রেও একটি বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রতিটি পোষা কুকুরের স্বাস্থ্য রেকর্ড, জলাতঙ্কের টিকা গ্রহণের তারিখ এবং মালিকের পরিচয় সংরক্ষণ করা থাকলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থা বহুদিন ধরেই কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশেও ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা গেলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক সংবেদনশীলতা। সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা ছোটবেলা থেকেই কুকুরকে ভয় পান। আবার কেউ কেউ অতীতে কুকুরের কামড়ের শিকার হয়েছেন। তাদের এই ভয়কে উপহাস করা বা অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া মোটেও মানবিক আচরণ নয়। একজন মানুষ যেমন প্রাণী ভালোবাসার অধিকার রাখেন, তেমনি আরেকজন মানুষের নিরাপদে চলাফেরা করার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজে এই দুই অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে কিছু মানুষ কুকুরের প্রতি সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করলেই তাকে অমানবিক বা নিষ্ঠুর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ বিষয়টি এত সরল নয়। একজন ব্যক্তি যদি তার শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন বা বারবার কুকুরের আক্রমণের মুখোমুখি হয়ে আতঙ্কিত থাকেন, তাহলে সেই উদ্বেগকে সম্মান করা উচিত। প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা কখনোই মানুষের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তির বিপরীতে দাঁড়াতে পারে না।

একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে যে, পথকুকুর সমস্যার সমাধান কোনো নিষ্ঠুরতা বা নির্বিচারে প্রাণী হত্যা নয়। বরং বৈজ্ঞানিক ও মানবিক পদ্ধতিতে টিকাদান, বন্ধ্যাকরণ এবং আশ্রয় ব্যবস্থার উন্নয়নই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এ কাজে সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রাণীকল্যাণ সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আজ সময় এসেছে প্রাণীপ্রেমকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যুক্ত করার। পোষা কুকুরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত টিকা দেওয়া, জনসমাগমস্থলে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা এবং অন্যের ভয় ও উদ্বেগকে সম্মান করা—এসবই একজন প্রকৃত কুকুরপ্রেমীর পরিচয় হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোরও উচিত নিয়মিত পথকুকুর ভ্যাকসিনেশন ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদার করা এবং এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করা।

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধে নয়, বরং মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের নিরাপত্তা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রাণী থাকবে, ভালোবাসাও থাকবে; কিন্তু সেই ভালোবাসার কারণে কোনো শিশু, কোনো বৃদ্ধ কিংবা কোনো সাধারণ মানুষকে আতঙ্ক নিয়ে পথ চলতে হবে না। কারণ, দায়িত্বহীন কুকুরপ্রেম সমাজের জন্য ঝুঁকি, আর দায়িত্বশীল প্রাণীপ্রেমই পারে মানবিক ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে।

লেখকঃ মোঃ নাজমুল হুদা মাসুদ, মেইন্টেইন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার । সাইবার সিকিউরিটি এনালিষ্ট (ঝই-ঈওজঞ) স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ ও জয়েন্ট সেক্রেটারি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি


মতামত

আরও পড়ুন