• ঢাকা
  • সোমবার , ২৪ আগস্ট ২০২৬ , সকাল ০৮:৪৫
শিরোনাম
হোম / বাণিজ্য
রিপোর্টার : অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
মিডফোর্ডের কপার স্ক্র্যাপ মার্কেটে শত শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

মিডফোর্ডের কপার স্ক্র্যাপ মার্কেটে শত শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

প্রিন্ট ভিউ

•  ৮০% কাঁচামাল কেনে করপোরেট ক্যাবলস কোম্পানিগুলো
•  ৩ হাজার দোকানে নেই ভ্যাট চালানের বালাই
•  নামমাত্র আমদানির আড়ালে বিশাল বাজার

বিশেষ প্রতিনিধি:
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মিডফোর্ড এলাকার বেচারাম দেউরি ও রজনী বোস লেন কপার স্ক্র্যাপ মার্কেটে চলছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব। বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার কাঁচামাল কেনাবেচা হলেও সরকারের কোষাগারে জমা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত ভ্যাট। ৩ হাজারের বেশি কপার ও অ্যালুমিনিয়াম স্ক্র্যাপের দোকানে নেই কোনো ভ্যাট চালানের ব্যবহার। অভিযোগ রয়েছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি করপোরেট গ্রুপ বৈদ্যুতিক ক্যাবলস তৈরির জন্য এখান থেকে কর ফাঁকি দিয়ে হাজার হাজার টন কপার স্ক্র্যাপ সংগ্রহ করছে।
যেভাবে চলছে কাঁচামাল সরবরাহ
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেচারাম দেউরি বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ কাঁচামাল জোগান দেয় মাত্র ৭-৮টি বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে মেসার্স রহিম মেটাল, বাঁধন মেটাল স্টোর, মেসার্স ইসরাত মেটাল স্টোর, প্যাসিফিক মেটাল, সাদিয়া মেটাল, জাহাঙ্গীর অ্যান্ড ব্রাদার্স, মৌসুমী/নিউ মৌসুমী এন্টারপ্রাইজ, আল কদর এবং এসএস এন্টারপ্রাইজ অন্যতম। ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার কৌশল হিসেবে একই ব্যবসায়ী একাধিক নামে দোকান পরিচালনা করছেন। অনেকে সামান্য ভ্যাট দিয়ে টিআইএন সার্টিফিকেট ঝুলিয়ে রাখলেও বাস্তবে কোনো প্রমান্য চালানের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
নেপথ্যে নামীদামি করপোরেট প্রতিষ্ঠান
বাজারের বড় সরবরাহকারীদের তথ্যানুযায়ী, এখান থেকে সবচেয়ে বেশি কপার স্ক্র্যাপ কিনছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিজলী ক্যাবলস)। পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে এসকিউ ওয়্যার অ্যান্ড ক্যাবলস। এছাড়া এমইপি ক্যাবলস, কপার টেক ইন্ডাস্ট্রিজ, পলি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা স্টার ক্যাবলস ও ফারহানা মেটাল ওয়ার্কসের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এই মার্কেট থেকে নিয়মিত স্ক্র্যাপ ক্রয় করছে।
এদের মধ্যে রংপুর মেটাল, এসকিউ, কপার টেক, মেঘনা স্টার ও ফারহানা মেটালের নিজস্ব কপার গলানোর চুল্লি বা মেল্টিং মেশিন রয়েছে। উৎপাদন খরচ কমাতে যেসব কোম্পানির চুল্লি নেই, তারা সরাসরি স্ক্র্যাপ কিনে এসব কোম্পানির চুল্লি থেকে চুক্তিভিত্তিক নির্দিষ্ট মাপে কপারের তার বানিয়ে নিচ্ছে।
আমদানি ও বিক্রির তথ্যে বিশাল অসঙ্গতি
আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১৪,২৮৮ টন কপার ক্যাথোড আমদানি হয়। এর মধ্যে বিআরবি ক্যাবলস একাই আমদানি করেছে ১০,৫৭৮ টন। অথচ বিআরবি ক্যাবলসের প্রায় সমপরিমাণ বাজার ও বিপণন কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও রংপুর মেটাল এ সময়ে আমদানি করেছে মাত্র ৪০২ টন। একইভাবে ওয়ালটন, পার্টেক্স, মোহাম্মাদী ইলেকট্রিক, কপারটেক ও পলি ক্যাবলসের ক্যাথোড আমদানির পরিমাণ বাজারে তাদের চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। আমদানিকৃত কাঁচামালের এই বিশাল ঘাটতি মূলত মেটানো হচ্ছে বেচারাম দেউরির ভ্যাটবিহীন স্ক্র্যাপ মার্কেট থেকে।
রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই মার্কেট থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১,৬০০ টন কপার স্ক্র্যাপ বিক্রি হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি কপারের গড় মূল্য ১,২০০ টাকার বেশি। প্রতি মাসে ভ্যাট না দিয়ে কেজিপ্রতি মাত্র ৬০ টাকা প্রক্রিয়াজাতকরণ মজুরি ধরে এই বিশাল কেনাবেচা সম্পন্ন হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের মতো প্রতিদিন দাম ওঠা-নামা করায় এই খাতে লাভের পরিমাণও বহুগুণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উদাসীনতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে অসাধু ক্যাবলস ও স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীরা রাজস্বের বড় একটি অংশ আত্মসাৎ করছে। এনবিআর অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ না নিলে এই ফাঁকির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বাড়তেই থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্য

আরও পড়ুন