• ঢাকা
  • শনিবার , ৮ আগস্ট ২০২৬ , সকাল ১১:০০
শিরোনাম
হোম / উপসম্পাদকীয়
রিপোর্টার : এম. শোয়েব চৌধুরী
মোহিনী মোহন চৌধুরী: কালজয়ী গানের সুরকার ও এক উপেক্ষিত নক্ষত্র

মোহিনী মোহন চৌধুরী: কালজয়ী গানের সুরকার ও এক উপেক্ষিত নক্ষত্র

প্রিন্ট ভিউ


​«মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কত প্রাণ হলো বলিদান,
লেখা আছে অশ্রুজলে…»
​সুর আর ছন্দের মোড়কে যে গানটি আজও বাঙালির রক্তে দোলা দেয়, জাতীয় চেতনাকে উদ্দীপিত করে এবং যেকোনো ন্যায়সংগ্রামের মুখরিত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়—সেই অমর গীতি «মুক্তির মন্দির সোপানতলে»। কত আন্দোলন, কত আত্মত্যাগের মহাকাব্য এই একটিমাত্র গানের চরণগুলোতে মূর্ত হয়ে উঠেছে! অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য, যিনি এই ইতিহাস-স্রষ্টা, সেই মহান গীতিকার ও সুরকার মোহিনী মোহন চৌধুরী আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক বেদনার নাম।

​তাঁর গানের সুরে বাঙালি হেসেছে, কেঁদেছে, জীবনকে নতুন করে ভালোবেসেছে। অথচ সৃষ্টি যার আকাশ স্পর্শ করেছে, স্রষ্টা হিসেবে তিনি থেকে গেছেন এক প্রচ্ছন্ন অন্ধকারে।
​মোহিনী মোহন চৌধুরীর জন্ম এই বাংলার পলিমাটিতেই—গোপালগঞ্জে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, অতীতের চাটুকারিতার রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে এই মহান গুণী মানুষটিকে ন্যূনতম সম্মানটুকু পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি আর আঞ্চলিকতার সংকীর্ণ বৃত্তে আটকে থেকে তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা এই কালজয়ী প্রতিভাকে মূল্যায়ন করেননি। ফলে কত অযোগ্য ও চাটুকার ব্যক্তি জাতীয় সম্মানে ভূষিত হলো, অথচ চিরউপেক্ষিত থেকে গেলেন এই অমর স্রষ্টা।

​বাংলা সংগ্যে মোহিনী মোহন চৌধুরীর অবদান কোনো একটি নির্দিষ্ট ধারায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রেম, প্রতিবাদ, প্রকৃতি আর আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব মিশেল ঘটেছে তাঁর সৃষ্টিতে। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিসম্ভারের কয়েকটির দিকে তাকালেই থমকে যেতে হয়:
​মুক্তির মন্দির সোপানতলে
​কাশ্মীর হতে কন্যাকুমারী
​দিন দুনিয়ার মালিক তোমার দিল কি দয়া হয় না
​জেগে আছি একা জেগে আছি কারাগারে
​ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে
​আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়
​এনেছি আমার শত জনমের প্রেম
​শতেক বরষ পরে
​কেন এ হৃদয় চঞ্চল হলো
​জয় হবে হবে জয়
​সুন্দরী লো সুন্দরী, দল বেঁধে আয় গান করি
​অভিনয় নয় গো, অভিনয় নয়
​পিয়া সনে মিলন পিয়াস
​ঝিলমিল ঝিলমিল ঝিলের জলে
​চৈতি সন্ধ্যা যায় বৃথা
​হায় কী যে করি এ মন নিয়া
​কী মিষ্টি দেখো মিষ্টি কী মিষ্টি এ সকাল
​সখি চন্দ্রবদনী, সুন্দরী ধনি
​রাজকুমারী ওলো নয়নপাতা খোল
​পৃথিবী আমারে চায়
​তুমি যদি বলো ভালোবাসা দিতে জানি না (প্রখ্যাত শিল্পী গীতা দত্তের গাওয়া প্রথম গান)
​শুনি তাকদুম তাকদুম বাজে ভাঙা ঢোল
​আজ চঞ্চল মন যদি
​ইতিহাস আমাদের শেখায় গুণীর কদর করতে। স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের নাগরিক, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন। সেটি ছিল শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি রাষ্ট্রীয় উদারতা ও দেশপ্রেমের এক মহিমান্বিত নিদর্শন।

​আজ আমরা এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আপনার নেতৃত্বে দেশবাসী এক নতুন ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা দেখতে চায়। মোহিনী মোহন চৌধুরী যেহেতু জন্মসূত্রে এই মাটিরই সন্তান, তাই দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাঁকে মরণোত্তর জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করা আজ রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

​আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতীতে গড়ে ওঠা চাটুকারিতার স্রোতে গা ভাসাবেন না। তিনি দল, মত, জাতি ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে গড়ে তুলবেন এক অদ্বিতীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ—যেখানে স্থান পাবে না কোনো হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, বিভেদ কিংবা বৈষম্য। কেবল প্রকৃত গুণীজনদের যোগ্য সম্মান জানানোর মাধ্যমেই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।
​(লেখক: প্রধান সম্পাদক দৈনিক দেশকাল l

মতামত

আরও পড়ুন