• ঢাকা
  • মঙ্গলবার , ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , রাত ০৩:১৪
শিরোনাম
হোম / মতামত
রিপোর্টার : -​সীমান্ত চৌধুরী

মবতন্ত্র নাকি আইনের শাসন: অর্থনৈতিক সংকট ও নৈরাজ্যের শঙ্কায় জনজীবন


মবতন্ত্র নাকি আইনের শাসন: অর্থনৈতিক সংকট ও নৈরাজ্যের শঙ্কায় জনজীবন

প্রিন্ট ভিউ

সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ অবনতি, লাগামহীন চাঁদাবাজি এবং মবতন্ত্র বা জনতা-শাসনের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। শহর থেকে গ্রাম,দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা একশ্রেণীর সুবিধাবাদী গোষ্ঠী আইনি কাঠামোকে সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে জমি ও সম্পত্তি দখল, বেপরোয়া চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সামাজিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব অপরাধ রুখতে দৃশ্যত স্থবির এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব জাহির করতেও ভীত বলে মনে হচ্ছে; কারণ সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো সরাসরি পুলিশ বাহিনীর ওপর চড়াও হতে দ্বিধা করছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাবকে কাজে লাগিয়ে এসব উচ্ছৃঙ্খল উপাদান নিজেদের আইনের চেয়েও বড় মনে করতে শুরু করেছে, যা ভেতর থেকে গণপ্রজাতন্ত্রের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিকেই চুরমার করে দিচ্ছে।

​রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রাতের অন্ধকারে চালানো তাণ্ডবের চেয়ে বড় কোনো উদাহরণ এই ভীতিকর পরিস্থিতির আর হতে পারে না। বিগত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অলাভজনক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বাৎসরিক প্রায় অর্ধ-মিলিয়ন সুবিধাবঞ্চিত মা ও শিশুকে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান করে আসছিল। অথচ গভীর রাতে ২০০ জনেরও বেশি সশস্ত্র ও মুখোশধারী ব্যক্তি সেই কেন্দ্রে হামলা চালায়, নিরাপত্তা রক্ষীদের জিম্মি করে, জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম লুটপাট করে এবং ভারী এক্সকাভেটর বা বুলডোজার দিয়ে পুরো কমপ্লেক্সটি মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে জনস্বাস্থ্যের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে এক রাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলো এই ঘটনাটি একটি কঠোর বার্তা দেয়: যখন আইনের শাসনের স্থলাভিষিক্ত হয় মবতন্ত্র, তখন কোনো প্রতিষ্ঠানই তা যতই মানবিক বা পবিত্র হোক না কেন আর নিরাপদ থাকে না।সেটা প্রথম আলো ডেইলি স্টার কিংবা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হোক l

​জননিরাপত্তার এই চরম ধস এমন এক মুহূর্তে ঘটেছে, যখন দেশের মানুষ এক পীড়াদায়ক অর্থনৈতিক সংকটে পিষ্ট হয়ে তাদের ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। রেকর্ড মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য মৌলিক জীবনধারণই এখন এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আর্থিক চাপের মুখে একের পর এক কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক রাতারাতি বেকারত্ব ও চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ছেন। কিন্তু এই বিপর্যস্ত পরিবার বা দেউলিয়া হতে যাওয়া ব্যবসাগুলোকে স্বস্তি বা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুতের চড়া ইউটিলিটি বিল, অতিরিক্ত রাজস্বের বোঝা এবং অন্যায্য কর। সমাজবিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে, দিশেহারা জনগণের ওপর এই ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা চাপানো কেবল নৈতিকভাবে অসমর্থনযোগ্যই নয়, বরং তা সামাজিক সৌহার্দ্যকেও পুরোপুরি বিনষ্ট করছে। যখন দারিদ্র্যের সাথে যুক্ত হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি, তখন সমাজের মানবিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে  , যার ফলে মাত্র একটি আইফোন কিংবা এক লোকমা ভাতের মতো নগণ্য বিষয়ের জন্য মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করার মতো জঘন্য অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে।

​বাংলাদেশের সামনে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাস এক স্পষ্ট ও মারাত্মক সতর্কবার্তা তুলে ধরছে। ইতিহাস প্রমাণ করে যে, যেসব দেশ তাদের আইনি পরিকাঠামোকে ধসে পড়তে দিয়েছে এবং মব-সংস্কৃতিকে তোষণ করেছে, তারা অনিবার্যভাবে চরম অর্থনৈতিক ধস ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন: একসময় আমাদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ অর্থনীতির অধিকারী থাকা সত্ত্বেও দেশটি আজ দেউলিয়া ও নিঃস্ব রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে ; কোনো সম্ভাবনার অভাবে নয়, বরং তার আইনি প্রতিষ্ঠানের ধস, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং অনিয়ন্ত্রিত মব-সংস্কৃতির সস্তা তোষণের কারণে। অনিয়ন্ত্রিত আইনহীনতা ও নীতিহীনতার পথ ধরে বাংলাদেশের সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হবে এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়, যা কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিকের কাম্য হতে পারে না।

​রাষ্ট্র আজ এক অত্যন্ত সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে যে, ভয়ভীতি দেখিয়ে, চোখ বুজে থেকে কিংবা সিলেক্টিভ বা পক্ষপাতমূলক আইন প্রয়োগ করে কখনো শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা যায় না। বিগত ১৭ বছরের ইতিহাস অত্যন্ত পরিষ্কার: আইনের শাসন লঙ্ঘন করা এবং জনগণের ক্ষোভকে দমন করার পরিণতি হিসেবেই তৈরি হয় রাজপথের অভ্যুত্থান ও শাসনব্যবস্থার পতন। আজ যদি মবতন্ত্রকে তোষণ করা হয়, তবে তা আগামী দিনের জন্য আরও বড় বিপর্যয়কে ডেকে আনবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সেই বিখ্যাত গণতান্ত্রিক আদর্শ—‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য’—অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের সময় এসেছে। রাষ্ট্রকে ভয় বা অনুগ্রহের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই মূল সত্যকে ধারণ করতে হবে: ক্ষমতা কোনো বন্দুকের নলে কিংবা মবের তাণ্ডবে থাকে না, বরং ক্ষমতার আসল উৎস হলো দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে রাষ্ট্রকে অনতিবিলম্বে মবতন্ত্র গুঁড়িয়ে দিতে হবে, কঠোর আইনের শাসন পুনপ্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং জনগণের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস অর্জনে মনোনিবেশ করতে হবে।

মতামত

আরও পড়ুন