• ঢাকা
  • রবিবার , ৮ নভেম্বর ২০২৬ , রাত ০২:০৮
শিরোনাম
হোম / উপসম্পাদকীয়
রিপোর্টার : মো: আল-আমীন চৌধুরী

চাপের মুখে মধ্যবিত্ত: অর্থনৈতিক টিকে থাকা দৈনন্দিন লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে?


চাপের মুখে মধ্যবিত্ত: অর্থনৈতিক টিকে থাকা দৈনন্দিন লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে?

প্রিন্ট ভিউ

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, অবকাঠামো এবং রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবুও এই অর্জনগুলোর আড়ালে একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উদ্বেগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে: মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য, আবাসন খরচ বৃদ্ধি, ব্যয়বহুল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় এবং বেতন স্থবিরতা ধীরে ধীরে বেতনভোগী পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ণ করছে। অনেক পরিবারের জন্য, একটি নিয়মিত চাকরি আর স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং, মাসিক বেতন উপার্জন করাটা এখন অপরিহার্য খরচ মেটানো, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয় বিসর্জন দেওয়ার এক অবিরাম প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭৫.৭ মিলিয়নে পৌঁছাবে। এই বিশাল জনসংখ্যা একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে, তেমনি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, শ্রমশক্তিতে প্রায় ৭১.৭১ মিলিয়ন মানুষ রয়েছে, যাদের মধ্যে ৬৯.০৯ মিলিয়ন কর্মরত এবং ২.৬২ মিলিয়ন বেকার। বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৩.৬৬ শতাংশ। তবে, এই পরিসংখ্যানগুলো আংশিক কর্মসংস্থান, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, অপর্যাপ্ত মজুরি অথবা যারা কাজ খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছেন, তাদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।

বিশ্বব্যাংক আরও উল্লেখ করেছে যে, প্রতি বছর প্রায় বিশ লক্ষ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এই ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তির জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে প্রায় চল্লিশ লক্ষ কর্মী কর্মরত এবং এটি পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে। পোশাক শিল্প ছাড়াও, লক্ষ লক্ষ মানুষ রিয়েল এস্টেট, কৃষি, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, ঔষধশিল্প, খুচরা ব্যবসা, নির্মাণ, পরিবহন, উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে।

তবে, কর্মসংস্থান মানেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নয়। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে, বেসরকারি খাতের অনেক কর্মচারী এমন বেতন পান যা একটি স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য অপর্যাপ্ত।

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চাপ হলো একটিমাত্র আয়ের উপর নির্ভরশীল একাধিক ব্যক্তির ভরণপোষণের দায়িত্ব। ২০২২ সালের জনসংখ্যা ও গৃহগণনা অনুসারে, বাংলাদেশের গড় পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় চার জন। তবে, অনেক পরিবারে একজন বেতনভোগী ব্যক্তি তার স্ত্রী/স্বামী, দুই সন্তান এবং কখনও কখনও বয়স্ক পিতামাতা বা অন্যান্য আত্মীয়দের ভরণপোষণ করেন।

মাসিক ৩৫,০০০ বা ৪০,০০০ টাকা বেতন প্রাথমিকভাবে যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। কিন্তু, যখন এই আয় দিয়ে পরিবারের চার বা পাঁচজন সদস্যের ভরণপোষণ করতে হয়, তখন আর্থিক সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একটি পরিবারকে খাদ্য, বাসস্থান, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, পোশাক, ইউটিলিটি বিল এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। এছাড়াও পিতামাতাকে সহায়তা করা, সঞ্চয় বজায় রাখা এবং জরুরি অবস্থার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার চাপ থাকে। ফলস্বরূপ, একজন উপার্জনকারী সদস্যের আয় প্রায়শই একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দায়িত্বের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

যখন কোনো পরিবার বেকারত্ব, অসুস্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন বা অবসরের কারণে তার একমাত্র আয়ের উৎস হারায়, তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মধ্যবিত্তের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অন্যতম প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ ও অংশগ্রহণ গবেষণা কেন্দ্র (পিপিআরসি) কর্তৃক ২০২৫ সালের একটি পারিবারিক জরিপে দেখা গেছে যে, গ্রামাঞ্চলে মধ্যবিত্ত ৪০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় প্রায় ২৮,৮১৮ টাকা, যেখানে তাদের ব্যয় ২৯,৭২৭ টাকা। শহুরে পরিবারগুলো গড়ে ৪০,৫৭৮ টাকা আয় করলেও মাসিক ব্যয় করে ৪৪,৯৬১ টাকা। এই ফলাফলগুলো পারিবারিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসামঞ্জস্যকে তুলে ধরে।

খাদ্যই হলো সবচেয়ে বড় পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয়। জরিপে অনুমান করা হয়েছে যে, জাতীয়ভাবে গড় পারিবারিক ব্যয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ বা প্রায় ২০,৬১৪ টাকা খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়। শহুরে পরিবারগুলো, বিশেষ করে যাদের সন্তান রয়েছে, তাদের মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি, ফলমূল, রান্নার তেল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি খরচ করতে হয়।

আবাসন আরেকটি বড় বোঝা। ঢাকা এবং অন্যান্য মহানগর এলাকার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো প্রায়শই তাদের বেতনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাড়ি ভাড়া, ইউটিলিটি বিল এবং যাতায়াত বাবদ ব্যয় করে, যার পরিমাণ প্রায় ২০,০০০/- টাকা। যেসব পরিবার কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকার সামর্থ্য রাখে না, তাদের যাতায়াতের জন্যও একটি বড় অঙ্কের খরচ বহন করতে হয়।

শিক্ষা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। স্কুলের বেতন, ভর্তি ফি, বইপত্র, ইউনিফর্ম, কোচিং, যাতায়াত এবং পরীক্ষার খরচ অভিভাবকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার মনে করে যে, সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যতের সুযোগ নিশ্চিত করতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য—এমনকি যখন এই ব্যয় তাদের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়, তখনও তারা তা বহন করার চেষ্টা করে।

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও সমান উদ্বেগের বিষয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ফি, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, ওষুধ, হাসপাতালের খরচ এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অনেক সময় কয়েক মাসের জমানো অর্থ শেষ হয়ে যায়। কার্যকর স্বাস্থ্য বিমার অভাবের কারণে অনেক পরিবারকে সরাসরি নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়।

পোশাক-আশাক বা অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচের বিষয়টি প্রায়শই স্থগিত রাখা হয়। প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে পরিবারগুলো কেনাকাটা কমিয়ে দেয়, বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ সীমিত করে ফেলে। উৎসব, বিয়ে, বাড়ির মেরামত এবং সন্তানদের বিশেষ প্রয়োজনে যে বার্ষিক ব্যয় হয়, তা তাদের আর্থিক হিসাব-নিকাশকে আরও এলোমেলো করে দেয়।

খাদ্য কেনার সামর্থ্যের বিষয়টি বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। ক্ষুধা নিবারণের মতো পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া মানেই যে পুষ্টিগুণে ভারসাম্যপূর্ণ খাবার পাওয়া—তা কিন্তু নয়। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের খাদ্য নিরাপত্তা মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ—যা মোট জনসংখ্যার ৩৮.৬ শতাংশ—স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কেনার সামর্থ্য রাখে না। ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি) অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের পেছনে ব্যয় দাঁড়ায় ৪.৫৯ মার্কিন ডলার।

যদিও এই পরিসংখ্যানটি কেবল মধ্যবিত্ত নয়, বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিত্র তুলে ধরে, তবুও এটি জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য কেনার সামর্থ্যের সংকটের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে।

বেতনভুক্ত পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে, খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে তারা প্রায়শই তাদের ভোগ বা খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। অনেক পরিবার মাছ, মাংস, দুধ, ফল এবং অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের কেনাকাটা কমিয়ে দেয় এবং এর পরিবর্তে চাল ও তুলনামূলক সস্তা শর্করাজাতীয় খাবারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা নিজেদের পুষ্টির চাহিদার সঙ্গে আপস করে সন্তানদের খাবারের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেন।

এই ধরনের পরিবর্তন শারীরিক স্বাস্থ্য, শিশুদের বিকাশ এবং কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক চাপের কারণে কর্মজীবী পরিবারগুলোকে যেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, যেখানে তাদের বাড়ি ভাড়া দেওয়া অথবা পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয়।

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বেতনের কাঠামো অত্যন্ত অসম। যেখানে উচ্চপদস্থ নির্বাহী বা বিশেষায়িত পেশাজীবীরা তুলনামূলক ভালো বেতন পান, সেখানে অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জুনিয়র ম্যানেজার, শিক্ষক, ব্যাংক কর্মী, বিক্রয়কর্মী এবং অন্যান্য বেতনভুক্ত পেশাজীবীরা অনেক কম আয় করেন।

পোশাক শিল্প খাতটি এই চ্যালেঞ্জের একটি বড় উদাহরণ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ইপিজেড-বহির্ভূত পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক, প্রশাসনিক এবং মধ্যম সারির কর্মীরা সাধারণত তুলনামূলক বেশি বেতন পেয়ে থাকেন; তবে অভিজ্ঞতা, কারখানার আকার এবং দায়িত্বের ভিন্নতার কারণে তাঁদের পারিশ্রমিকেও বড় ধরনের তারতম্য দেখা যায়।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নির্ধারণকারী কোনো সামগ্রিক জাতীয় ডেটাবেস নেই। তা সত্ত্বেও, বেসরকারি খাতের অনেক পেশায় যাঁরা মাসে ২৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা আয় করেন, তাঁরা প্রায়শই তীব্র আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হতে পারেন—বিশেষ করে যখন শহুরে পরিবারে তাঁরাই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হন।

মূল সমস্যাটি কেবল বেতনের পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা হলো বেতনের ক্রয়ক্ষমতা। যখন মজুরির তুলনায় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন প্রকৃত আয় কমে যায়, সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে যায় এবং পারিবারিক ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।

অনেক দেশ জীবনযাত্রার ব্যয়জনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মজুরি সুরক্ষা, সাশ্রয়ী সরকারি পরিষেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইউরোপের দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন সমন্বয়, বেকারত্ব সুরক্ষা এবং সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবার মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সিঙ্গাপুরে আবাসন নীতি, বাধ্যতামূলক সঞ্চয় এবং সুনির্দিষ্ট সহায়তা কর্মসূচির সমন্বয় রয়েছে; অন্যদিকে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো ব্যাপক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী সরকারি পরিষেবা বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশের অন্য কোনো দেশের অর্থনৈতিক মডেল হুবহু অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। তবে, এটি নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।

মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ সরকারকে কিছু নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য সরকারকে একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় বেতন নীতি প্রণয়ন করতে হবে। মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, উৎপাদনশীলতা এবং পারিবারিক খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিতভাবে বেতন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ন্যূনতম মজুরি এবং খাতভিত্তিক বেতন কাঠামো এমন হতে হবে যেন তা কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সরকারকে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে এবং কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো, মজুতদারি, সিন্ডিকেট ও অন্যায্য ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে হবে। কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে খামার পর্যায় থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত মূল্যের ব্যবধান কমানো যায়।

তৃতীয়ত, সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থাকে জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য করতে হবে। সরকারি সহায়তায় ভাড়ার ভিত্তিতে আবাসন সুবিধা, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা এবং উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা শহুরে পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

চতুর্থত, সাশ্রয়ী রোগ নির্ণয় সেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্বাস্থ্য বিমা এবং উন্নত হাসপাতাল সুবিধার মাধ্যমে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে হবে। একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি থাকলে জরুরি স্বাস্থ্য সংকটের কারণে পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের মুখে পড়ার ঝুঁকি কমে আসবে।

পঞ্চমত, শিক্ষাকে আরও সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করে তুলতে হবে। মানসম্মত সরকারি বিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং বৃত্তি কর্মসূচি ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষা ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে।

ষষ্ঠত, স্বল্প আয়ের পরিবারের পাশাপাশি বেতনভুক্ত কিন্তু অসহায় অবস্থায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট খাদ্য সহায়তা ও পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি চালু করতে হবে। বিদ্যালয়ে খাবার কর্মসূচি, সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য বিক্রয় কেন্দ্র এবং উন্নত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা পুষ্টিমান বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের প্রয়োজন আরও শক্তিশালী কর্মসংস্থান নীতি, বেকারত্ব বিমা, অবসরকালীন সুরক্ষা এবং সাশ্রয়ী শিশুযত্ন ব্যবস্থা। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের প্রসার, বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদান এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ের বাইরে এসে আরও উন্নত জীবন গড়ার সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তারা কর প্রদান, ভোগ, বিনিয়োগ, শিক্ষা, পেশাগত সেবা এবং জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখে। কিন্তু যখন বেতনভুক্ত পরিবারগুলো পর্যাপ্ত খাবার, উপযুক্ত বাসস্থান, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বহন করতে পারে না, তখন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ে। অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়। বরং সাধারণ নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার সক্ষমতার ভিত্তিতেও একে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একটি দেশ কখনোই টেকসই ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে না, যদি তার মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্থবির আয়ের যাঁতাকলে আটকা পড়ে থাকে। সরকার, বেসরকারি খাতের নিয়োগকর্তা এবং নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই এটি অনুধাবন করতে হবে যে, একটি সম্মানজনক বেতন, সাশ্রয়ী সরকারি পরিষেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা—এগুলো কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অপরিহার্য ভিত্তি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত পরীক্ষা এটি নয় যে দেশটি কত সম্পদ অর্জন করছে, বরং আসল পরীক্ষা হলো—একটি সাধারণ শ্রমজীবী পরিবার মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছে কি না, সন্তানদের শিক্ষিত করতে পারছে কি না, পুষ্টিকর খাবারের সংস্থান করতে পারছে কি না, যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করতে পারছে কি না।

লেখক: মো: আল-আমীন চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক দেশকাল, আইসিটি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা.


মতামত

আরও পড়ুন