বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি মানুষ নানাবিধ থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে আক্রান্তদের ৫০ শতাংশই নারী, যাদের আবার ৬০ শতাংশই জানেন না যে তারা থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত। থাইরয়েড রোগের প্রতিরোধ, আধুনিক চিকিৎসা, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির (বিটিএস) ৮ম আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দিনব্যাপী এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— “Thyroid Care: Through Education, Innovation and Intervention”।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রধান অতিথির বক্তব্য
সকাল ১১টায় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, “মানুষের জন্য মানসম্মত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। থাইরয়েডসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক সমাজ, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।” স্বাস্থ্যসেবা ও থাইরয়েড সচেতনতায় বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি উপস্থিত চিকিৎসকদের দেশের স্বার্থে নিরলসভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বিটিএসের সভাপতি ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালাইড সায়েন্সেসের (নিনমাস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন:
অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ — সভাপতি, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)
অধ্যাপক ডা. এম এ করিম — প্রধান উপদেষ্টা, বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটি
অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান — সভাপতি, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বাডাস)
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিটিএসের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. নাসরীন সুলতানা এবং বিটিএসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ফৌজিয়া মোসলেম বক্তব্য প্রদান করেন।
থাইরয়েড পরিস্থিতির চিত্র ও আধুনিক প্রযুক্তি
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী দেশের থাইরয়েড পরিস্থিতির ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান:
মোট আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ২ শতাংশ থাইরয়েড ক্যান্সারে ভুগছেন।
প্রতি ২,৩০০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন জন্মগত থাইরয়েড সমস্যা নিয়ে জন্মায়।
প্রি-কনফারেন্স ওয়ার্কশপে তিনি উল্লেখ করেন, থাইরয়েড নোডিউলের (Thyroid Nodule) ৭৮ শতাংশই 'হাই রেজোলিউশন আল্ট্রাসাউন্ড' দিয়ে নিখুঁতভাবে নির্ণয় সম্ভব। এর মধ্যে ৩২% সিস্টিক (Cystic), ২% ক্যান্সার এবং বাকিগুলো বিনাইন (Benign)। বর্তমানে বিনা অপারেশনে রেডিওফ্রিকোয়েন্সির (Radiofrequency) মাধ্যমেও এর আধুনিক চিকিৎসা সম্ভব।
দিনব্যাপী বৈজ্ঞানিক অধিবেশন ও বিশেষজ্ঞ আলোচনা
সকাল ৮টায় রেজিস্ট্রেশন, প্রমোশনাল ভিডিও প্রদর্শনী এবং ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্লেনারি সেশনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। পরবর্তীতে দিনব্যাপী তিনটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা থাইরয়েড চিকিৎসার আধুনিক বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন:
1. ডিফারেনশিয়েটেড থাইরয়েড কার্সিনোমা: সোহরাওয়ার্দী ইনমাসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জীনাত জাবীন নিউক্লিয়ার মেডিসিনের উদীয়মান ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
2. গর্ভকালীন থাইরয়েড সমস্যা: ওজিএসবি (OGSB) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম গর্ভকালীন থাইরয়েড জটিলতার চিকিৎসা বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
3. আয়োডিন ঘাটতি: বিএসএমএমইউ-এর এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম দেশে আয়োডিন ঘাটতিজনিত ব্যাধি নিয়ে কথা বলেন।
4. জটিল কেস ও ক্লিনিক্যাল বিচার-বিবেচনা: ডা. এম সাইফুদ্দীন (Dr. M. Saifuddin) জটিল থাইরয়েড কেস ও ক্লিনিক্যাল দিক বিশ্লেষণ করেন।
5. ক্যান্সার সার্জারি ও নেক ডিসেকশন: থাইরয়েড ক্যান্সারে নেক ডিসেকশনের পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অধ্যাপক ডা. মো. আবদুস সাত্তার এবং রোগী পর্যবেক্ষণ বনাম সার্জারির সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আলী আজাদ বক্তব্য দেন।
6. চোখের রোগ ও বায়োপসি: থাইরয়েডজনিত চোখের রোগের চিকিৎসায় অধ্যাপক ডা. মো. শওকত কবীর এবং নিডল কোর বায়োপসির ব্যবহার নিয়ে কথা বলেন অধ্যাপক কর্নেল ডা. মো. ইকবাল করিম।
7. রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন ও হৃদরোগ ঝুঁকি: ডা. মোহাম্মদ হানিফ রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন অ্যাবলেশন, ডা. দিন-ই-মুজাহিদ মোহাম্মদ ফারুক ওসমানী থাইরয়েড ও হৃদযন্ত্রের জটিল সম্পর্ক (Heart Failure/Arrhythmia) এবং ডা. জেসমিন ফেরদৌস রেডিওআয়োডিন-রিফ্র্যাক্টরি ক্যান্সারের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা নিয়ে তথ্য উপস্থাপন করেন।
গবেষণাপত্র উপস্থাপন ও সমাপনী
বিকেলের সেশনে ১২টি মৌখিক (Oral) এবং ১০টি পোস্টার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এতে দেশে অনির্ণীত থাইরয়েড অসুখ, থাইরয়েড অটোইমিউনিটি, রেডিওআয়োডিন চিকিৎসার পর লালাগ্রন্থির ক্ষতি, জিনগত বিশ্লেষণ ও বিরল কেস রিপোর্ট স্থান পায়। বিচারকদের মূল্যায়নে সেরা উপস্থাপকদের পুরস্কৃত করা হয়।
বিকেল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত বিটিএসের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতির সমাপনী বক্তব্য ও চা-বিরতির মাধ্যমে সফল এই সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।