সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজের মাধ্যমে মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগে বাংলাদেশি নাগরিক মো. নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি (ইতি) আক্তার নামের দুই নারী-পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি সরকার। মক্কা অঞ্চলে রাজকীয় অধ্যাদেশ এবং 'তা’জীর' (Ta'zir) শরীয়াহ আইনের আওতায় এই সাজা দেওয়া ও শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করার কথা নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে ঘটনার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও বিস্ময়কর দিক হলো—সৌদি কর্তৃপক্ষ ঠিক কোন মসজিদের ভেতরে ঘটনাটি ঘটেছিল কিংবা ‘অনৈতিক’ বলতে তারা কী বুঝিয়েছিল, তার কোনো স্পষ্ট বিবরণ প্রকাশ করেনি; পুরো তদন্ত, দ্রুতগতিতে অভিযোগ গঠন, বিচারপ্রক্রিয়া, রায় এবং রাজকীয় আদেশ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা হয়েছে চরম গোপনীয়তায়।
আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী এবং ১৯৬৩ সালের 'ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস' অনুযায়ী, বিদেশি কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলে বা তার বিরুদ্ধে গুরুতর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে স্বাগতিক রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে তাৎক্ষণিক অবহিত করতে এবং আইনি সহায়তা (Consular Access) প্রদানে বাধ্য। অথচ এই পুরো প্রক্রিয়ার বিষয়ে জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিছুই জানতে পারেনি। দুই নাগরিকের জীবনহানির পর জেদ্দাস্থ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি 'নোট ভারবাল' (Note Verbale) পাঠিয়ে ঘটনার তথাকথিত ‘আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি’ চেয়েছে। মরদেহ পাওয়ার পর কূটনৈতিক চিঠি পাঠানোর এই ঘটনাকে দেশের প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দূতাবাসের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার সচেতন মহল, যাদের মতে শক্তিশালী বা প্রভাবশালী কোনো দেশের নাগরিক হলে আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড না মেনে এভাবে দ্রুত বিচারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হতো না।
জানা গেছে, এই ঘটনার নেপথ্যে পাকিস্তানের এক নাগরিক ভিডিও ধারণ করেছিল। অতীতেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশিদের অবমূল্যায়ন ও ছোট করার চক্রান্ত দেখা গেছে; যেমন ২০০৭ সালে আরব আমিরাতে এক পাকিস্তানি নাগরিকের আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে ৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তবে ২০১০ সালে তৎকালীন সরকার দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রায় ৯৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ‘ব্লাডমানি’ পরিশোধের মাধ্যমে তাদের মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল। অথচ বর্তমানে প্রবাসী নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা দিতে কূটনৈতিক যোগাযোগের চরম স্থবিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি অভিবাসী, বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং রহস্যজনক মৃত্যুর বিষয়টি দীর্ঘদিনের। ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো নিজ দেশের নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় কড়া শর্ত দিলে সৌদি আরব তা প্রত্যাখ্যান করে এবং ওই দেশগুলো নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে 'নারী গৃহকর্মী পাঠানোর বাধ্যতামূলক শর্তে' বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ থাকা পুরুষ শ্রমিকের বাজার পুনর্গঠন করা হয়। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর নির্যাতন সইতে না পেরে শত শত নারী গৃহকর্মী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন, আর যারা মৃত্যুবরণ করেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ময়নাতদন্ত ছাড়া সেগুলোকে 'স্ট্রোক' বা 'আত্মহত্যা' বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল সুরক্ষার স্বার্থে কোনো শর্ত আরোপের চেষ্টা করলে সৌদি পক্ষ উল্টো 'নারী না দিলে পুরুষ শ্রমিকও নেওয়া হবে না' বলে হুঁশিয়ারি দেয় এবং বৈশ্বিক মুদ্রার (ডলার) চাহিদায় নীতি-নির্ধারকরা সেই অন্যায্য শর্ত মেনে নেন।
সাংবাদিক জামাল খাসোগির নির্মম হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বিশ্বমঞ্চে সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে, তাই বাংলাদেশি শ্রমিকদের সস্তা শ্রম হিসেবে বিবেচনা করে তাদের আত্মমর্যাদা ও মৌলিক আইনি অধিকারকে বলি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞরা দাবি জানিয়েছেন, অবিলম্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবহেলা ও দায়বদ্ধতা তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং কোনো সতর্কীকরণ ও কূটনৈতিক প্রটোকল না মেনে নিজ নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এই ঘটনা জাতিসংঘ (UN), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch)-এর মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা জরুরি, কারণ কেবল রেমিট্যান্স অর্জনের জন্য দেশের নাগরিকদের জীবন ও রাষ্ট্রীয় আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া যায় না।